|

"ঘরের গরু আঙিনার ঘাস খায় না":সেই জেনারেল প্রাক্টিশনারকে বলছি


Published: 2017-09-18 11:08:15 BdST, Updated: 2017-12-18 16:34:27 BdST

 

 

 

 

 

ডা. এ. হাসনাত শাহীন
মেডিসিন, ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ
বি আই এইচ এস জেনারেল হাসপাতাল।

________________________________

বাজার থেকে নিয়মিত যার কাছ থেকে ফল কিনেন,একদিন জানতে পারলেন ওই ফলবিক্রেতা তার দোকানের কোন ফল খান না। ব্যাটা নিশ্চয় এতকাল কার্বাইড আর ফর্মালিন মিশ্রিত ফল বিক্রি করতো, নইলে খাবে না কেন? কাল থেকে নিশ্চয় ওই দোকান থেকে ফল কেনা বন্ধ? পরিবারের সবাইকে নিয়ে যে ফাস্টফুড শপে নিয়মিত খেতে প্রায়শই আসেন একদিন জানতে পারলেন ওই ফাস্টফুড শপের কেউই ওখানকার কোন খাবার মুখে দেন না। এতদিন কি তাহলে পচা,বাসি আর ভেজাল খাবার আপনাদেরকে পরিবেশন করছিল? আর না,ফ্রি দিলেও ওখনটায় আপনার পা আর পড়বেনা।

 

যে গোয়ালা তার গরুর দুধ নিজে খায় না, যে দর্জি তার নিজের তৈরি করা পোশাক পড়ে না, যে খাদ্যপ্রস্তুতকারি তার প্রস্তুতকৃত খাদ্য নিজে গ্রহণ করে না, আপনি নিজেও অন্তত জেনেশুনে সেই পন্য বা সেবা তার কাছ থেকে নিবেন না। তেমনি চিকিৎসাও একটি সেবা,অবশ্যই মহৎ একটি সেবা। একজন রোগি বা সেবাগ্রহীতা হিসেবে অবশ্যই পছন্দনীয় যে কোন জায়গা থেকে সেটা নেয়ার আপনার সর্বাত্মক অধিকার রয়েছে। অন্যান্য মানুষের মত একজন চিকিৎসকেরও এই অধিকার রয়েছে। চিকিৎসক বন্ধু, আপনি বা আপনার পরিজন যখন অসুস্থ হন অবশ্যই চিকিৎসাসেবা নেয়ার অধিকার আপনি সংরক্ষণ করেন। আর সেকারনেই আমার অনেক সহকর্মীকে দেখতে পাই নিজে বা পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে অথবা একটু হেলথ চেক আপের জন্য ব্যাংকক,সিংগাপুর,ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ছুটতে। এমনও সহকর্মী দেখতে পাই যিনি বছরের পর বছর জেনারেল প্রাক্টিসে শত শত ডায়াবেটিস,হাইপারটেনশনের রুগিদেরকে অহরহ এন্টিডায়াবেটিকস,এন্টিহাইপারটেনসিভ ঔষধ অনায়াসে লিখে যাচ্ছেন। অথচ নিজের মায়ের সামান্য একটু ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যাওয়ায় শুধুমাত্র এন্টিহাইপারটেনসিভ একটি ঔষধের পরামর্শের জন্য দেশের প্রখ্যাত এক কার্ডিওলজিস্ট শরণাপন্ন হন বহু রেফারেন্স ধরে। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন এখানে অপরাধটা কোথায়? আমার মতে এখানে এই সেবা নেয়াটায় কোন অপরাধ নেই।

 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এতদিন কি আপনি না জেনে বা অল্পজ্ঞানে ওইসব ডায়াবেটিস বা হাইপারটেনসিভ রোগির চিকিৎসা করে গেছেন? এই দেশের চিকিৎসার মান খারাপ বলেই কি আপনার বা আপনার পরিবারের কোন স্বাস্থ্যসমস্যায় বা নিতান্তই হেলথ চেক-আপের জন্য দেশের বাইরে ছুটে যান। এই দেশে কি একজনও আপনার সহকর্মী বা সিনিয়র যোগ্য চিকিৎসক নেই? এই দেশের কি সব ল্যাবরেটরি টেস্টের রিপোর্ট ভুল? এইদেশে কি একটিও হাসপাতাল নেই যার তুলনা বাইরের দেশের সাথে করা যায়? কিছুদিন পূর্বে আমার এক সহকর্মী বলেন তিনি যেখানে চাকরি করেন সেখানকার চিকিৎসাসেবা নিয়ে তার আস্থা নেই। তার পরিবারের চিকিৎসা তিনি অন্যখানে করান। আমার প্রশ্ন,যে প্রতিষ্ঠানের তিনি একজন কর্মী সেই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা সেবা নিয়ে যদি তার আস্থা না থাকে তাহলে কোন আস্থার ভিত্তিতে উনি রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এটা কি একধরণের প্রতারণা নয়? সাধারণ মানুষের এইসব ধারনাকে আমার কাছে অতটা দোষের মনে হয় না, যতটা দূষণীয় মনে হয় চিকিৎসকদের বেলায়।

 

একজন চিকিৎসক একটি দেশের,একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অবশ্যই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই চিকিৎসকেরই যদি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, সর্বোপরি তার নিজের অগ্রজ ও অনুজ চিকিৎসক সহকর্মীদের প্রতি এমন বিশ্বাসের ঘাটতি থাকে,আস্থাহীনতা থাকে তবে সেই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার ঘাটতি কখনো বাড়বে বৈ কমবে না। কথায় বলে " ঘড়ের গরু আঙিনার ঘাস খায় না "। এতে গরুই ক্ষুধার্ত থাকে, ঘাসের কোন ক্ষতি হয় না। আমরা এই মহান চিকিৎসা সেবার জ্ঞান অর্জন করেছি অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। আর এই জ্ঞান আমরা অর্জন করেছি মানবকল্যাণে ব্যয় করার জন্য। নিজের নামের সাথে তকমা আটার জন্য নয়। সবার অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা এক নয়। তাই সবাইকে এক পাল্লায় পরিমাপ করাও ঠিক নয়। আপনি একজন চিকিৎসক হিসেবে যদি আস্থার সাথে আপনার বা আপনার স্বজনদেরকে আপনার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে স্বাস্থ্য সেবা দিতে না পারেন, তবে ওই একই সেবা অন্য কাউকে দেয়া অপরাধের শামিল। আমরা কেউই সর্ব বিশেষজ্ঞ নই। তাই অবশ্যই যেখানে আমার ঘাটতি আছে সেখানে অভিজ্ঞদের সাহায্য নিতে হবে।

________________________________


ডা. এ. হাসনাত শাহীন
মেডিসিন, ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ
বি আই এইচ এস জেনারেল হাসপাতাল।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।