|

নারী ডাক্তারদের সন্তানদের করুণ সত্য কাহিনী : চোখে জল আসবে


Published: 2017-01-08 09:18:36 BdST, Updated: 2017-01-20 05:31:03 BdST

 

 

ডা. শিরিন সাবিহা তন্বী
___________________________

 


বছর কয়েক আগের কথা।এক সিনিয়র ম্যাডামের ওখানে কাজ করতাম।কাজের অবসরে ওনার রুমে নানা বিষয়ে গল্প হতো।
সেদিন ম্যাডামের মন ভাল ছিল না।জানা গেল ছেলে দুদিন আগে চড়া দামে এক এলসেশিয়ান কুকুর কিনেছে।আজ হঠাৎ রাগ হওয়াতে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে ওটাকে মেরেছে।শুনেই মনটা খারাপ হলো।

 


ম্যাডামের বক্তব্যে যেটুকু বুঝেছিলেম - তার বড় ছেলেটা ভীষন মা ন্যাওটা ছিল ছোটবেলায়।হাসপাতালে ইমার্জেন্সী ওটি করে ফিরতে ফিরতে ম্যাডামের যখন অনেক রাত হতো,বাড়ীর সবাই ঘুমিয়ে গেলেও সেই এতটুকু বয়স থেকে জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে থাকত এই ছেলে!মা ঘরে ঢুকলে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠত।এরপরে ম্যাডামের ডিগ্রী,বড় ডাক্তার হবার উঁচুনিচু জীবন পথ পাড়ি দিতে ছেলে মায়ের থেকে দূরে সরেছে,বুকের মধ্যে অভিমান জমা হয়ে হয়ে ক্রোধের বিষবাষ্প হয়েছে।এর পরের ইভেন্ট যদিও সুখকর,তবে ম্যাডামের জন্য শ্রমসাপেক্ষ!তিনি প্রচন্ড ধৈর্য্য আর নিষ্ঠায় ওকে স্বাভাবিক করেছেন।
কিন্তু এই গল্প ঘরে ঘরে প্রায় প্রতিটি নারী চিকিৎসক পরিবারে।

 


সব মায়েরা যখন ঈদের আগে চাঁদরাতে বেবীদের নিয়ে শপিং এ যায় কিংবা মজার মজার রান্না করে,ডাক্তার মায়ের সন্তানটি হয়ত বুয়ার কোলে বিষন্ন শুয়ে,বার বার ঘড়ি দেখে।সময় যেন পাথর ওদের কাছে!
যখন সব মায়েরা রেজাল্ট উপলক্ষে শিশুদের বুকে নিয়ে স্কুলে যায়,সাহস দেয় - ডাক্তার মা টি বোধ হয় তখন কোন ক্রিটিকাল রুগীর অপারেশনে ব্যস্ত।মনেই নাই,মেয়ের রেজাল্ট।


ঈদে/পূজায়,নববর্ষে বা জন্মদিনে আলু ভর্তা ভাত কিংবা ফ্রিজের নুডুলস খেয়ে কাটানো শিশু নারী ডাক্তারদের ঘরে ঘরে।
সবথেকে কষ্টদায়ক - এদের দুঃখ বুঝবার জন্য সরকার,জনগন যতটাই বিমুখ।কখনও কখনও পরিবারের সদস্যরাও।

 

ছেলের প্রফেশন যাই হোক আজকার ঘরে একটা ডাক্তার বউ না থাকলে যেন স্ট্যাটাস বজায় থাকে না।তাই বেনারসী,গয়নায় মুড়ে বউ করে অনেকেই ডাক্তার বউ ঘরে আনে।কিন্তু এই বউটি যে সমাজের আর দশটি মেয়েদের মত না।সে যে বাঁধা পরে আছে তার রুগীদের কাছে তা ভুলে যায়।
বহু জুনিয়র ডাক্তার সন্তানদের মায়ের কাছে রেখে পোষ্ট গ্রাজুয়েশন ট্রেনিং করে।আত্মীয় পরিজন কেবল এটাই দেখে।কিন্তু ডেলিভারীর পরে মায়ের কোলে বাচ্চা তুলে দিতে কিংবা অন্যের বাচ্চার চিকিৎসা করতে করতে ডাক্তার মায়ের ও চোখ ভেজে।দিনের শেষে আধাঁর রাতে সবাই যখন নিজের সন্তান বুকে নিয়ে নিদ্রা যায় ট্রেনিং এ থাকা ডাক্তার মায়ের ও বুকের ভেতর টা খাঁ খাঁ করে।সন্তানের স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে!
আজকাল অনেক মেয়ে ডাক্তার ই চাকরীর বেতনে অর্থকষ্টে জীবন যাপন টাকে মেনে নেয়।প্রাকটিস করছেন না?এই প্রশ্নে চাপা হাসির উত্তর জোটে।কেবল মাত্র সংসারে এতটুকু বেশী সময়,সন্তানকে একটু আশ্রয় দিতেই স্বচ্ছলতার হাতছানি অনায়াসে উপেক্ষা করতে হয়।

 

মেয়ে ডাক্তার কেবল সোকেসে সাজিয়ে রাখার শোপিস নয়!তার কাঁধ টা সমাজের আর দশটা মেয়ের মতই।বড় নয়।তার সন্তানরাও সমাজের আর সব শিশুর মতই,আলাদা কিছু নয়।তার উপরে সমাজ সংসারের আব্দারের মাত্রাটা কখন ও যেন সীমাহীন না হয়!
এই অত্যন্ত কর্তব্যনিষ্ঠ চিকিৎসা পেশায় থেকে আপনার এবং আপনাদের চিকিৎসায় বাংলাদেশের এই অবকাঠামোতে,এত এত অভাব অভিযোগ মেনে নিয়ে যেসব নারী চিকিৎসক তাদের নিজের জীবনের আরাম এবং সন্তানদের খুশিকে জলাঞ্জলি দিয়ে,, যে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে,তার জন্য এতটুকু কৃতজ্ঞতা কেবল তাদের আত্মতৃপ্তি ই দিবে না।দিবে আপনাদেরকে আরো উন্নত চিকিৎসা দানের আত্মপ্রত্যয় !!

 

অসুস্থ হলে চিকিৎসক হলেও আমি নিজেই একজন রুগী।আমার সন্তান পৃথিবীর মুখ দেখেছে একজন নারী চিকিৎসকের হাত ধরেই!তাই,,বাংলাদেশের সব নারী চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

__________________________________

 

ডা. শিরিন সাবিহা তন্বী । দেশের জনপ্রিয় কলামিস্ট। মহৎপ্রতিভাবান কথাশিল্পী। মেডিকেল অফিসার, শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।