|

ওয়ার্ডের যে অভিজ্ঞতা ফিকশনকেও হার মানায় : সেই মেয়েটির গল্প


Published: 2017-01-03 12:50:25 BdST, Updated: 2017-03-26 07:36:34 BdST

 


মডেল ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

________________________

 

 

ডা. রাজীব হোসাইন সরকার

_____________________
·

নিউরো- সার্জারীতে নাইট ডিউটি করার সময় প্রায়ই এক অল্পবয়সী মেয়ে আমার রুমে আসত।
তার গায়ের রঙ কালো। বেটে। গায়ে সস্তা ধরণের পোশাক। মেয়েটির চুল বেশ লম্বা। হাটুতে পড়ত। চুলে কেউ একজন চপচপ করে নারিকেল তেল দিয়ে দিয়েছে।
মেয়েটি আমাকে বলত,
'ডাক্তার আমার প্রেশারটা মেপে দিবেন?'
আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করতাম মেয়েটির সব থেকে সুন্দর হল তার গলার স্বর। এত চমৎকার স্বরে কেউ কথা বলতে পারে? আমি বিস্মিত হতাম।
আমি জিজ্ঞাসা করতাম,
'ভর্তি হয়েছেন?'
মেয়েটি যেন অপরাধ করে ফেলেছে এমনভাবে বলত,
'না ভর্তি হইনি। আজ বিকেলে আমি পড়ে গিয়েছিলাম। প্রেশার ফল করেছিল। তাই মাপতে এসেছি।'
'ভর্তি প্যাশেন্ট ছাড়া আমরা কারো গায়ে হাত দিইনা। সরি।'
'প্লিজ দেখে দেন না। ডাক্তার সাদিয়া আপু দুপুরে মেপে দিয়েছে। সে খুব ভালো।'
'কোন সাদিয়া? সাদিয়া সুলতানা, সাদিয়া শারমিন, সাদিয়া মোবাশ্বিরা নাকি সাদিয়া শর্মী? এরা সবাই আমার ব্যাচমেট ডাক্তার?'
মেয়েটি সাদিয়া চতুষ্টয়কে আলাদা করতে পারল না। কিছুটা লজ্জা পেল। অতিরিক্তরকম মন খারাপ নিয়ে চলে গেল।

আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের ধারনা, মেয়েটি আর কখনো আসবে না। কমবয়সী মেয়েদের আত্মসম্মানবোধ অতিরিক্তরকম প্রবল।

আমার ধারণা ভুল প্রমানিত হল। রাত তিনটায় একটা ছোট বাচ্চাকে সাথে নিয়ে এসে বলল,
'প্লিজ দেখে দিন না প্রেশারটা। আমার খুব খারাপ লাগছে।'
আমি দেখে দিলাম না। ফিরিয়ে দিলাম।

উল্লেখ্য- ভর্তি রোগী ছাড়া আমার কোন অধিকার বা নির্দেশনা নেই কারো গায়ে হাত দেবার।


হাসপাতালের ভেতরে কেউ খারাপ অনুভব করলে তাকে ভর্তি কাগজ ছাড়া চিকিৎসাও দিতে পারব না। নিউরো- সার্জারী এমনিতেই ভয়াবহ একটি ওয়ার্ড। এখানে প্রতিটি সেকেন্ড অপেক্ষায় থাকতে হয় কোন একজন রোগীর মৃত্যু ডিক্লেয়ার করার জন্য। মাঝেমাঝে এত দ্রুত রোগী মারা যায় যে আগে থেকে ডেথ সার্টিফিকেট লিখে রাখতে হয়। শুধু রোগীর নাম বসিয়ে দিয়ে সময় বাচানোর জন্য। তাহলে চিকিৎসাজনিত ব্যস্ততা কোন পর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্নরাই বুঝতে পারবে । মেয়েটি সেই রাতে মোট চারবার ঘুরে গেল।

 

শেষরাতে মহিলা ইউনিটে এক হেড ইঞ্জুরির মহিলা মারা গেল। আমি লাশের পাশে বসে ডেথ ডিক্লেয়ার করছি। পিউপিল, ক্যারোটিড পালস বিবিধ দেখছি। মৃত মহিলার পাশে এক মেয়ে পড়ে আছে। তাকে কোলে তুলে রেখেছে একজন মধ্যবয়স্ক নারী। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'এই মেয়ের কি হইছে মা?'
মহিলা বললেন,
'মায়ের এক্সিডেন্টের পর থেকে মেয়েটা অসুস্থ্য স্যার। বারবার ফিট হয়ে যাচ্ছে। প্রেশার কমে যাচ্ছে ঘনঘন। মাথায় তেল চপচপ করে দিয়েও কাজ হয়না। খুব ঝামেলায় আছি স্যার। তার উপর তার মা মরে গেল।।'

ডিউটি ডাক্তার রুমে বসে মৃত মহিলার ডেথ সার্টিফিকেট লিখলাম। আমার পাশে ছোট একটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। সে ডেথ সার্টিফিকেট নিজ হাতে নিয়ে যাবে। এই ছেলের হাত ধরেই এক মেয়ে অনেকবার এসেছিল আমার কাছে প্রেশার মাপতে। আমি মেপে দিইনি। মেয়েটা এবার আসেনি কারণ সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। তার মায়ের ডেথ সার্টিফিকেট নিতে আসার মত সুস্থ্যতা তার নেই।

মানুষ হিসাবে আমি নিতান্তই নগন্য এবং নিম্ন বুদ্ধিমত্তার। নিম্নবুদ্ধিমত্তার মানুষের অনেক দোষ। এরা ঘটনা ঘটে যাবার পর বড় আফসোস নিয়ে বলে, আগেই কেন করলাম না এটা... কেন!

নতুন বছরে আমার মত নিম্নবুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষদের প্রতি রইল অতিরিক্তরকম শুভকামনা। নতুন বছরে কোন ব্যাপারেই বড় আফসোস নিয়ে যেন না বলতে হয়, 'আগেই কেন করলাম না এটা.... কেন!

_______________________

 

লেখক ডা. রাজীব হোসাইন সরকার । অনন্য , প্রতিভাবান কথাশিল্পী। চিকিৎসক , রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।