|

জবাবদিহি ডাক্তারের হলে ক্ষমতা ডাক্তারের হাতে নয় কেন


Published: 2017-01-02 13:06:08 BdST, Updated: 2017-05-27 14:06:15 BdST

ডা. রাজীব দে সরকার
______________________________


‘সেবা’ শব্দটা সরকারী বেসরকারী কাজে নানা ভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমনঃ পুলিশ সেবা সপ্তাহ, আইনী সেবা, নাগরিক সেবা, সেচ্ছাসেবক, ব্যাঙ্ক ঋণ সেবা ইত্যাদি।

আরেকটা থীম আছে, সেটা হলো সরকারী চাকুরীজীবী মানেই ‘জনগণের সেবক’ বা সেবাদানকারী। যেমন একজন পুলিশ, একজন ম্যাজিসট্রেট, একজন সচিব সবাই জনগণের সেবক।

অথচ ‘সেবা’ শব্দটি সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত হয় আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারন হাসপাতালগুলোতে অসুস্থ মানুষ সরাসরি সেবা পান। ক্ল্যাসিকালি সেবা বলতে যা বোঝায় তা স্বাস্থ্যসেবাখাতেই পাওয়া যায় সহজে নির্বিঘ্নে।

সেবা নিয়ে এতো বিশ্লেষণ করার কারন আছে। একজন সেবাদাতা এবং একজন সেবাগ্রহীতার মধ্যে সম্পর্কের মান উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। হাসপাতালে এই সেবাদান কর্মকান্ডের অগ্রভাবে বা ফেস এ থাকেন চিকিৎসকেরা। তাই সেবার মান যদি আশানুরূপ না হয়, সেক্ষেত্রে চিকিৎসককেই জবাবদিহি করতে হয় কিংবা রোষানলে পড়তে হয়।

যেমন রাউন্ডে গেলে ডাক্তাররা কমন কিছু কথা শোনেন।

– স্লামালিকুম চাচা, আজ কেমন আছেন, পায়ের ব্যাথাটা কমেছে কিছুটা?

– ব্যাথা তো কমছে ডাক্তার সাব। কিন্তু আপনাদের বাথরুমটায় যে গন্ধ, গেলেই পেট গুলায়, বমি বমি লাগে। বমি বন্ধের ওষুদ দ্যান।

(উল্লেখ্য ঐ বাথরুম ডাক্তার সাহেব ব্যবহার করেন না। রোগীরাই ব্যবহার করে। সুতরাং গন্ধ হলে রোগীদের কারনেই তা হয়। বাথরুম পরিষ্কার রাখা কোন অ্যাঙ্গেলেই ডাক্তারের কাজ না। এর জন্য পদায়িত সুইপার থাকেন।)

সুইপার যদি তার কাজ ঠিকমতো না করেন, তার জন্য কিন্তু ডাক্তারকেই জবাবদিহি করতে হয়। রোগী বা রোগীর লোক সুইপারের মুখও হয়তো দেখেনা। একজন বিসিএস অফিসার হয়েও রোগীর রোগ সারিয়েও তিনি অসহায় অনুভব করেন। কারন জবাবদিহির কাঠগড়ায় তাঁকে দাড়াতে হচ্ছে। অন্য কাউকে না।

 

আমরা ভুলে যাই, হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মান ভালো না মন্দ এর দায় এককভাবে ডাক্তারের উপর যায় না। কিন্তু ডাক্তারকেই কথাগুলোর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। কারন এই হেলথ কেয়ার সিস্টেম এর ফ্রন্টে থাকেন তিনি। অথচ একজন ডাক্তারের হাতে ক্ষমতা নেই। তার অধস্তনদের উপর চাপ সৃষ্টির কোন বৈধ সামর্থ্য তার নেই।

 

মন্ত্রী এমপিরাও তাদের বক্তব্যে হুশিয়ারী দেন ডাক্তারদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার জন্য। ডাক্তারদের শাসনে রাখতে তারা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অথচ এই একই ধরনের কথা/শাসন কোন এক অজ্ঞাত কারনে মন্ত্রী-এমপিরা অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, সুইপার, স্যাকমো, আয়া, ওটি বয়, নৈশ প্রহরীদের উপর দেখাতে পারেন না বা চান না।

 

যদি কোন পল্লী চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় কোন রোগীর কোন ক্ষতি হয় এবং রোগী যদি হাসপাতালে এসে মৃত্যুবরণ করেন তার দায়ও ঐ ডাক্তারের উপরই বর্তায়। কারন এ রকম কোয়াকদের শাস্তিবিধানের কোন বৈধ ম্যাজিস্ট্রেসী পাওয়ার একজন সরকারী চিকিৎসককে দেওয়া হয়নি।

 

কিছুদিন আগেই বমির ওষুধের পরিবর্তে অস্ত্রোপাচারে ব্যবহার্য্য চেতনানাশক ঔষধ দিয়ে একজন জীবিত সুস্থ মানুষকে মেরে ফেললো এক ওষুধের দোকানদার। এর কোন ফলো-আপ নিউজই আর হলো না। দোকানদারদের সামলাতে পারেন এমন হর্তাকর্তা বোধ করি প্রশাসনে এখনো আসেননি। অথচ এরকম দোকানদাররা কোন রকম সমীহই করেন না একজন সরকারী চিকিৎসককে।

আমার হাসপাতালে আমার সহকর্মীরাই এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। অথচ এই চিকিৎসকেরই সমমর্যাদার একজন ‘নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট’ কিংবা ‘এএসপি’ যমের মতো ভয় পায় এসব অসাধু ব্যবসায়ী। কারনটা কি কেউ ভেবে দেখেছেন?

যাই হোক, কথা বলছিলাম, সেবা নিয়ে। যিনি সেবা দেবেন, সেবার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি কি অবগত নন?

এলাকার পাতিনেতারা এসে যখন সেবার মান নিয়ে কথা বলেন, তখন তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য কোন ডিফেন্স সেল আমাদের নেই। একজন ডাক্তারকে আপনি তার সামনে দাঁড়িয়েই গালি দিতে পারেন। তারই সমমর্যাদার একজন এএসপিকে কিছু বলতে গেলেও আপনাকে অন্তঃত ১ ডজন কন্সট্যাবলের প্রাচীর পেরিয়ে যেতে হবে।

 

যাই হোক, এখন সময় সেবাকে সংজ্ঞায়িত করার। সেবার মানসিকতা নিয়েই ডাক্তাররা এই হাসপাতাল গুলোতে ঢোকেন। যদি সেবাদানে কোন বিচ্যুতি খুঁজে পান, জেনে রাখুন এর জন্য কোন না কোন ভাবে আপনিও দায়ী।

নিজেদের চিকিৎসা জীবনের শুরুতেই সম্পূর্ণ বিনা কারনে কিছুদিন আগে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হলেন ডাঃ মামুন, আর গতকাল ডাঃ পরাগ। দুজনেই ইন্টার্নী চিকিৎসক। এদের হতেই আগামীতে সেবা পাবেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

অথচ কী দিলাম আমরা এই দু'জন চিকিৎসককে? এরকম ঘটনা বাংলাদেশে একটি দু'টি নয়। অজস্র।

এমন বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলছি যেখানে যে চিকিৎসক আজ আপনার বাবা-মা’র জন্য সারাটা রাত জাগলেন, সেই চিকিৎসকের উপরেই আপনারই মতো কেউ, কোন না কোনদিন, হাত তুলেছিলো।

সমাজের এই চিত্র যতোদিন না পালটাবে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। সেবা গ্রহণ করার মানসিকতাও এই জাতিকে তৈরী করতে হবে।

যার কাছ থেকে সেবা নিচ্ছেন তারও ক্ষুধা লাগে, জ্বর আসে, রাগ হয়, অভিমান হয়, তারও আপন কেউ আছে, ঘরে ফুটফুটে একটা মেয়ে আছে। সর্বোপরি তিনিও একজন মানুষ এবং আপনার সেবা দেবার পেশায় এসে তিনি কোন পাপ করেননি।


ঈদে পূজায় বড়দিনে, হরতাল অবরোধে, শৈত্যপ্রবাহের রাতগুলোকে সব সময় আমাদের হাসপাতালগুলো খোলা ছিলো। দিনে ২৪ ঘন্টা, বছরে ৩৬৫ দিন। তাই সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন করার আগে সেবার ইতিহাসটুকুর কথা মনে করা উচিৎ।

একজন ডাক্তার ১০০ জন রোগীকে ভালো করে বাড়ি পাঠালেন, আর একজন রোগীর জন্য তাঁকে শারীরিক/মানসিকভাবে লাঞ্ছনা, গ্রেফতার, হয়রানি, সাজা –
এই মানসিকতা পরিবর্তন হলেই সেবার মান নিয়ে আর প্রশ্ন থাকবে না।

যা জাতি চিকিৎসকের উপর হাত তোলে, সে জাতির উপর ঈশ্বরের হাত কতোক্ষণই বা থাকবে? এদেরকেই তো 'সেকেন্ড গড' বলেন আপনারা।

জয়তু বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজ।

___________________________

 

লিখেছেন
ডা. রাজীব দে সরকার
বিশেষ কর্মকর্তা, কো-অর্ডিনেশন সেল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।