Ameen Qudir

Published:
2019-02-09 18:55:51 BdST

রোগী কথনজরায়ু এবং তার দুঃখরা




 

ডা. ছাবিকুন নাহার
_______________________

অনেকদিন থেকেই নতুন রোগী কথনে হাত দিতে পারছি না। প্রোফাইল ঘাটাঘাটি করে পুরনো লেখা পড়ি। যেটা একটু বেশি পুরনো সেটা টুক করে পোষ্ট করে ফেলি। রিপোষ্ট কথাটাও লিখি না। নতুনদের কিছু ফিডব্যাক পেলেও পুরনো পাঠকেরা ঠিকই আমার চালাকি ধরে ফেলে। এক কষ্ট দুইবার না করার মতো বুদ্ধি তাদের যথেষ্ট আছে। ফলে রোগী কথন পোষ্ট তো করেছি, এই আত্মতৃপ্তির চেয়ে, নিজেকে দেয়া নিজের ফাঁকিটা পোড়ায় বেশি। কেউ না জানুক কোন কারনে...গানটার মতো ফাঁকিটা মনে বাজতেই থাকে, বাজতেই থাকে।

এদিকে খুব বড় বিখ্যাত এক লেখক বন্ধু সালমা সিদ্দিকা আমাকে ফাইব্রয়েড সম্বন্ধে লিখতে বলছে। এই লেভেলের কেউ আমার লেখা পড়ে! বাহ! আমি তো ভাবতাম, গরীব লেখক আমি, বিখ্যাতরা না পড়লে না পড়ুক। যে কজন দয়া করে পড়ে এই বেশি। নিজের দৌড় তো আমি জানি। খুশিতে বাকবাকুম হয়ে সুহৃদকে কথা দিয়ে ফেললুম, যাও, এরপরের রোগী কথনটা হবে তোমার অনারে। বলে তো দিয়েছি হৃদয়ের কথা কিন্তু লেখা তো আর আসে না। হায় হায় শেয়ালের কুমির ছানা দেখানোর মতো এক লেখা বারবার পোষ্ট করি আর বন্ধুর মুখটি কল্পনা করি। চোখের কোনা দিয়ে দেখতে পাই, সে চাঁদমুখে ভেংচি কেটে বলছে, এই তোমার প্রতিশ্রুতি!

বন্ধু, আজকে আমি ফাইব্রয়েড ইউটেরাস নিয়ে লিখবই লিখব। কোন অপশক্তিই আমাকে আর থামাতে পারবেনা, বলে দিলুম, হুম। অনেক হলো বকবক। আরেহ্, ফাইব্রয়েড কি সেটাই তো বললাম না। সারা রাত রামায়ণ পড়ে সীতা কার বাপ টাইপ হয়ে গেলো গো। আচ্ছা আসুন জানি:

* আগে বলি, জরায়ু বা ইউটেরাস কি?
আমাদের অর্থাৎ মেয়েদের পেটের ভিতর থলে জাতীয় একটা অঙ্গ। যেখান থেকে মাসিক হয়, বাচ্চা হয়। আরেকটা কথা, আমাদের জীবনের শুরুটা কিন্তু হয় মায়ের জরায়ুতে। আমাদের জরায়ু আছে কি নাই সেটা নিশ্চিত না হলেও, আমরা যে কারো জরায়ুতে ছিলাম, এটা কিন্তু নিশ্চিত।

* ফাইব্রয়েড ইউটেরাস কি?
জরায়ুর টিউমারকে বলে ফাইব্রয়েড ইউটেরাস। মহিলাদের সবচেয়ে বড় সলিড এবং সবচেয়ে বেশি হওয়া টিউমারের নামও এটি।

* কতজনের হয়?
বিশ বছর বয়সে শতকরা বিশভাগ মানুষের, চল্লিশ বছর বয়সে শতকরা চল্লিশভাগ মহিলার এই টিউমার হয়ে থাকে। চোখটা কপাল থেকে নামান ভাউলোক। একদম সত্যি কথা বলছি। কোন কোন গোত্রের ক্ষেত্রে আরো বেশি হয়।

* কাদের বেশি হয়?
বাচ্চা না হওয়া, স্থুলতা, জেনেটিক, ব্ল্যাক ইত্যাদি।

* কাদের কম হয়?
যাদের বাচ্চাকাচ্চা বেশি, যারা সিগারেট খায়। এই কথা শুনে ভগিনীগন আবার সিগারেটের প্রতি ঝুঁকে পরলে আমার দোষ নাই, আগেই বলে রাখলুম।

* উপসর্গ কি?
তার কী আর শেষ আছে! কী হয়না বলেন! বাচ্চাকাচ্চা হতে চায়না, হলেও আবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বেশি বেশি মাসিকের রক্ত যায়। মাসিকের সময় ব্যথা। তলপেটে চাপ ধরে থাকে। ভারী ভারী লাগে। বেশি বড় হলে পেটে চাকা হাতে লাগে। প্রসাব পায়খানা করতে সমস্যা, প্রসাবে ইনফেকশন এবং আরো বহুবিধ সমস্যার কারন এই টিউমার সাহেব।

* ডায়াগনোসিস কিভাবে করে?
খুব সহজ, সিম্পল একটা আল্ট্রাসোনোগ্রাম শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে এটি নির্ণয় করতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে এম আর আই লাগে।

* চিকিৎসা?
যার যা সমস্যা সে অনুযায়ী চিকিৎসা। সবার সমস্যা এক রকম না ও হতে পারে। কেউ কেউ বুঝতেই পারেন না যে, তার জরায়ুতে অতিথি বাসা বেঁধেছে, চিকিৎসা দূর কি বাত। সেক্ষেত্রে টিউমার ছোট থাকলে (বারো সপ্তাহ প্রেগন্যান্ট সইজ) চিকিৎসা না করালেও চলে। কিন্তু সাইজ এরচেয়ে বড় হয়ে গেলে উপসর্গ থাকুক আর না থাকুক, চিকিৎসা করাতে হবে। কারো কারো এত্ত রক্ত যায় যে, রোগী রক্তশূন্যতায় ভোগে। সে ক্ষেত্রে ঔষধ দিয়ে চিকিৎসার পাশাপাশি রক্ত দেয়াও লাগতে পারে। যা বললাম সবই কনজারভেটিভ চিকিৎসা।

ডেফিনিটিভ চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন করে শত্রুমুক্ত হওয়া। অপারেশন আবার অনেক ধরনের আছে, জরায়ু রেখে, জরায়ু ফেলে দিয়ে। আরো অনেক পদ্ধতি আছে চিকিৎসা করার।
মজার কথা হলো এরা একা থাকতে পারে আবার ভাই বোন সমেত থোকায় থোকায়ও থাকতে পারে। এমন দুষ্টু একবার চিকিৎসা করলে আবারো হতে পারে। ঐ যে বলেনা, গাছ থাকলে ফল...সে জন্য জরায়ু ফেলে দিয়ে চিকিৎসা করাটা বেশি ভালো, রোগী যদি বয়স্ক হয় এবং অন্য চিকিৎসায় কাজ না হয়।

এই রে, লেখা এত্ত বড় হইসে, যে কয়জন পড়ে তারা আবার ভয় না পায়! ভয় পাইয়েন না সুহৃদ শেষ করছি একটা কথা দিয়ে। যত টিউমার মহিলাদের শরীরে থাকে তারমধ্যে জরায়ুর টিউমার ফাইব্রয়েড সবচেয়ে নীরিহ এবং ভদ্রলোক। বছরের পর বছর থাকলেও ক্যানসার হওয়ার চান্স মাত্র ০′২℅. কাজেই টিউমার শুনেই প্যানিক হওয়ার কিছু নেই। রোগ যেহেতু আছে, চিকিৎসা ও আছে। সময় মতো চিকিৎসা নিন, ভালো থাকুন।

আর হ্যাঁ পুরুষ আপনাকে বলছি ভাই, আপনার জরায়ু নাই তো কি হয়েছে আপনার প্রিয়জনের তো আছে। একটু সময় করে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, প্রিয়জন তা নিয়ে ঠিকঠাক আছে কিনা? না নিলে না নিয়েছেন, এখন নিন। সময় তো ফুরিয়ে যায় নি। আপনার একটু সহমর্মিতা তার চোখে ভরসা এনে দিতে পারে, কষ্ট সহ্য করার সাহস দিতে পারে। ভালোবাসায় আপ্লুত করতে পারে। নতুন শুরু আপনাকে দিয়েই হোক। যা আমাদের আছে আর যা আমাদের নেই, সব নিয়েই যেনো আমরা ভালো থাকি, প্রিয়জনকে ভালো রাখি।

ডা. ছাবিকুন নাহার
মেডিকেল অফিসার
ঢাকা মেডিকেল কলেজ , ঢাকা।


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়