Ameen Qudir

Published:
2018-05-24 11:49:24 BdST

'ম্যাডাম, মেয়েটা পাগল রাস্তায় দেখে নিয়ে এলাম,পায়ে কেমন করে জানি ব্যথা পেয়েছে'



লেখকের ছবি

 


ডা. মিথিলা ফেরদৌস; ঢাকা
__________________________

এক লোক সাথে এক ১৮/১৯ বছরের মেয়ে নিয়ে আমার রুমে ঢুকলো।মেয়ের চুল উষ্কখুষ্ক,পরনে বেশ ময়লা কাপড়, দৃষ্টি ফাকা,আমাকে দেখেও দেখছেনা,রুমের চারিদিকে কি জানি খুঁজছে। লোকটি বলল,

:ম্যাডাম, মেয়েটা পাগল রাস্তায় দেখে নিয়ে এলাম,পায়ে কেমন করে জানি ব্যথা পেয়েছে।
ক্ষতস্থান দেখলাম,গুরুতর কিছু না।বেশ কিছু জায়গা ছড়ে গিয়েছে। লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম,
: আপনি উনাকে চেনেন?
:না ম্যাডাম,রাস্তায় দেখি খোঁড়ায় খোঁড়ায় হাটছে,তখন পায়ের দিকে দেখলাম রক্ত গড়াচ্ছে তাই নিয়ে আসলাম।
হাসপাতালে ব্যাথার ঔষধ আর গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ ছাড়া এন্টিবায়োটিক সাপ্লাই নাই।থাকার কথাও না।এত রুগী,সেই তুলনার অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দ।
মেয়েটা উশখুশ করছে,

:পানি খাবো।
বলেই দ্রুত বেসিনের সামনে রাখা গ্লাস নিয়ে বেসিনের পানি খেয়ে ফেললো।খুব মায়া হলো,কম বয়সী মায়া ভরা মুখটা দেখে।
লোকটাকে বললাম,
:আপনি ড্রেসিং রুম থেকে একটু কষ্ট করে ড্রেসিং করে এনে দিবেন প্লিজ?
:ম্যাডাম,আমি আমার বাচ্চাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে আসছিলাম।
আমি অনুরোধ করলাম,লোকটা মেয়েটিকে ড্রেসিং(ক্ষত পরিষ্কার) করে নিয়ে আসলো।আমি হাসপাতালের সাপ্লাই ঔষধ লিখে, এন্টিবায়োটিক লিখে,ব্যাগ থেকে টাকা বের লোকটিকে দিয়ে বললাম।
: ভাই,আরেকটু কষ্ট করে ঔষধ আর এক জোড়া স্যান্ডেল হাসপাতালের সামনে থেকে কিনে দিতে পারবেন?
লোকটা ঘাড় কাত করে,মেয়েটিকে নিয়ে চলে যাওয়ার সময় শুধু বলল,
:ম্যাডাম,আপনি এত করতে পারলে,আমিও এইটুকু করতে পারবো।
আমি খুব কষ্টে হেসে বললাম,
:আপনার তুলনায় আমি কিছুই করিনি।আপনাদের মত লোকের জন্যে হয়তো,এখন ভাল ভাল কিছু আমরা দেখতে পারি।

লোকটি যাওয়ার কিছুক্ষন পরই আমার মনে হলো,মেয়েটিকে শুধু ঔষধ কিনে দিলে তো হবে না,ওকে ঔষধ ঠিকমতো খাওয়াবে কে?তাছাড়া মেয়েটির পায়ে জুতাও ছিলো না,পায়ে ইনফেকশন হওয়ার চান্স অনেক বেশি,ময়লা পায়ে থাকে।পা টা পরিষ্কার রাখাও দরকার।সামান্য ছিলে গেলেও, পা তাই যত্ন নেয়া বেশি দরকার।মনটা খারাপ হয়ে গেলো,আমার ক্ষমতা সীমিত, সামর্থ্য তেমন না।আমি চাইলেও আমার ইমোশনকে কাজে লাগায় মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে পারিনা।হাসপাতালে এমনিতেই ওভারলোডেড রুগী,অনেক খারাপ রুগীই সিট পায়না।বিষন্নতায় মনটা ভরে থাকলো।এমন প্রায়ই হাসপাতালে হয়,যাদের অর্থ সাহায্য ছাড়া আমার পক্ষে কিছুই করার থাকেনা।

এখন,যখন পড়ি,ফ্লাটের জন্যে বরাদ্দ,সরকারি প্লট বরাদ্দ,গাড়ি এমন কি গাড়ি মেনটেনেন্সের জন্যে বরাদ্দ,সবচেয়ে মজার মজার ব্যাপার দামি মোবাইলের জন্যেও অর্থ বরাদ্দ হয়,এমনকি মোবাইল বিলের জন্যেও অর্থ বরাদ্দ।তখন মনে হয়,আমরা কি পারিনা,আমাদের বিলাসী জীবনে কিছু ছাড় দিয়ে এইসব মানুষের জন্যে কিছু করতে?!!এরাও তো এই দেশেরই নাগরিক।হাসপাতালে সীমিত বেডের বিপরীতে অনেক রুগীর জন্যে বরাদ্দ অনেক কম,ঔষধ এর সরবারাহ অনেক কম,ডাক্তাররা তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত রুগীদের শ্রম দিয়েও মানুষকে সন্তোষ্ট করতে অক্ষম।

তবে ভালমানুষও আছে,সেই লোক যিনি এনেছিলেন,এমন মানুষ যদি,সেইসব জায়গায় থাকতো,তাহলে সাধারণ মানুষের কষ্টটা অন্তত বুঝতেন।আয়েশি খাতে বরাদ্দ কমায়ে,দুস্থদের জন্যে করা গেলে,এইসব অসহায় মানুষগুলো কিছুটা সুস্থ সুন্দর ভাবে বেচে থাকতো।
_____________________________

ডা. মিথিলা ফেরদৌস; ঢাকা


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়