Ameen Qudir

Published:
2018-03-31 13:32:56 BdST

রোগী কথন মেয়েরা সাবধান মায়েরাও সাবধান : শিশু সিমির ভয়ঙ্কর কাহিনি আর যেন কারও জীবনে না ঘটে


১১ বছর বয়সী একটি সাহসী স্বপ্নময় কিশোরীর প্রতিকী মুখ। বিশ্বজয়ের সম্ভাবনা তার। কিন্তু বাবামার ভুলে তার জীবনে ঘটে যেতে পারে মনন ভাংচুর করা কোন দুর্ঘট। না। কোন কন্যাশিশুই যেন অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটের শিকার না হয়। শপথ নিতে হবে আমাদের।


ডা.ছাবিকুন নাহার
____________________________
শেষাংশঃ-মেয়েরা সাবধান মায়েরাও সাবধান :

আমি জানি আপনারা অধীর অপেক্ষা করে আছেন। স্যরি আপনাদেরকে অপেক্ষা করানোর জন্য। সিমির সাথে কথোপকথনের আগে আসুন সিমিদের প্রাথমিক কিছু তথ্য জেনে নেই।

সিমিরা দুই ভাই বোন। ভাইটা সেভেনে পড়ে। ওরা থাকে মায়ের সাথে। ঢাকায়। মা একটা স্কুলে চাকরি করেন। বাবা সৌদি আরব থাকেন। গত পাঁচ বছরে একবারও দেশে আসতে পারেনি। তবে ঠিকই টাকা পয়সা পাঠায়। মা যে বাবাকে নিয়ে খুব একটা খুশি না, কিংবা বাবা মা এর সাথে ঝামেলা চলছে, এটা সিমি বোঝে। বাবা নাকি সৌদি আরবে আরেকটা বিয়ে করেছেন! বাবা যদি এটা করে থাকেন, তাহলে খুব খারাপ করেছেন। মা কখনো বাবাকে মাফ করবেন না।

যদিও এটা সিমি কিংবা তার ভাই কেউই বিশ্বাস করেনা যে, বাবা এটা করতে পারেন। তবে তার মাকে এ নিয়ে বিচলিত কিংবা রিলিফ কোন দলে ফেলবে এটা ওরা বুঝতে পারেনা। যাক সব বুঝে কাজ ও নাই। তবে তিনতলার নাবিদ( ছদ্ম নাম) আংকেল আসলে মা একটু যেনো ওদের সাথে সহজ হয়। পড়াশোনা নিয়ে রাগারাগি তেমন করেন না।

মা ভাবেন, সিমিটার বোধ বুদ্ধি ও হয়নি তেমন। তা না হলে, যখন তখন নাবিদের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে? বলতে দ্বিধা নেই এতে মা মনেমনে খুশিই হয়। নাবিদকে তার সন্তানরা পছন্দ করুক এটা সে চায়। একটু বেশিই চায়। কেনো চায় সেটা আমরা পরে জানব। নাবিদটাও হয়েছে এমন, সিমি সামিনকে চোখে হারায়।

নাবিদ আংকেল খুব ভালো। অবিবাহিত। বয়স ঊনত্রিশ। মায়ের চেয়ে একবছরের ছোট। সুন্দর। ভদ্র। একটা বেসরকারি ব্যাংকে আছে। সময় অসময় ওদের বাসায় আসেন। প্রয়োজনীয় টুকিটাকি কাজ করে দেন। ওদের খুব খেয়াল করেন। কথায় বলে, কোনো মায়ের মনে ঢুকতে চাইলে তার সন্তানের প্রশংসা করো। নাবিদ আংকেল এই কথাটা মনে হয় ভালোই জানে। নাবিদের কর্মতৎপরতা আর অমায়িক ব্যাবহার মাকে মুগ্ধ করে। মুগ্ধতা এমন পরিমান পৌঁছে যে, একসময় একটু একটু করে মায়ের মনে জায়গা করে নেয়। মা ও বাবার মধ্যে যে গ্যাপটুকু ছিলো, সেখান দিয়ে নাবিদ ঢুকে পড়ে। কথায় আছে প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। কোন না কোন উপায়ে শূন্যতা পূর্ন হয়েই যায়।

৩.
সিমি ও ডাক্তার নামিহার কথেপকথনে আসি এবার-

: সিমি ভয় নেই। সব বলো। কিভাবে এমনটা হলো?

: নাবিদ আংকেল আমাকে খুব আদর করেন। প্রথম প্রথম খুব ব্যাথা পেতাম। ব্যাথা হতো। হাঁটতে পারতাম না। কিন্তু নাবিদ আংকেল বলতেন, এমন করেই আদর করতে হয়।

: মাকে বলোনি কেনো?
আংকেল মানা করতেন। বললে মা নাকি কষ্ট পাবেন।
তাছাড়া মা নাকি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। আমাকেই নাকি খারাপ বলবেন।

: কতদিন থেকে এমন?
তিন বছর ধরে। প্রায় প্রতিদিন। প্রথম প্রথম আমার খারাপ লাগত। পরে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।

একটা অন্যায় যখন দিনের পর দিন চলতে থাকে, তখন মানুষ এটাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এটাকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। যেটা সিমির ক্ষেত্রে হয়ছে।

হিসেব করে দেখলাম, প্রথম যখন শুরু। তখন সিমির বয়স সাত। কোলে নিয়ে আদর করার ছলে, তারপর...

যেহেতু নিয়মিত এই কাজ করা হতো, তাই হয়তো
প্রথম ওভুলেশনেই বাচ্চা এসে যায়। মাসিক হওয়ার আগেই। আর ঔ লোক এমনি বেপরোয়া ছিলো যে, প্রেগন্যান্ট অবস্থায়ও ছাড়ে নি। এই সেদিনও ছিলো। তারপরই ব্যাথা উঠে যায়। প্রসব ব্যথা।

৪.
তারপরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। পুলিশের কাছে অভিযুক্ত কালপ্রিট স্বীকার করেছে সব। মেয়েটার নাকি সম্মতি ছিলো! একটা শিশুর সাথে তার সম্মতিতে ও যদি শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, এটা ধর্ষন।
তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়, সিমির পেলভিস ডেভেলপড না। নরমাল ডেলিভারি করা যাবে না। তাই সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সিমির বাচ্চা কে ডেলিভারি করা হয়েছে। একটা ফুঁটফুঁটে ছেলে হয়েছে। সৃষ্টিকর্তার এ এক অপার মহানুভবতা। জন্ম প্রক্রিয়ার ছাপ নবজাতক কপালে দেন না। তার দুনিয়ায় কোনো বিবেদ নাই। বিভেদ করি আমরা। মানুষেরা।

একে তো সিমি মাত্র বছর দশ এগারোর শিশু মা। তারপর সামাজিকতা, লোক লজ্জার ভয়, ভবিষ্যৎ সব চিন্তা করে বাচ্চাটার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে একটা সেফ হোমকে। খুবই গোপনীয়তার মাঝে। ডাক্তারি বিদ্যার ইথিক্স মেনে আমাকেও নাম ধাম পরিবর্তন করে দিতে হলো।

আহারে বাচ্চাটা! বড়দের পঙ্কিলতার জবাব তাকে কড়ায় গন্ডায় দিতে হবে। পদে পদে। অথচ এই জন্মে তার কোন হাতই নেই। থাকে না কোন কালে।

সিমিকে দেখে বোঝার উপায় নাই, সে কী একটা কনসিকোয়েন্সের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বরং একটু পুতুল খেলা টাইপ মনে হলো। এই খেললাম। আবার এই বাদ দিলাম টাইপ আরকি! একটা বাচ্চা ভয়াবহ একটা পরিস্থিতিকে খেলা হিসাবে নিচ্ছে! এই ব্যাপারটাই আমি নিতে পারছি না। অসুস্থ বোধ করছি।

৫.
সিমির মাকে প্রশ্ন করি। আপনি বোঝেন নি? মহিলা কিছু বলেন না। কেবলি কাঁদছেন। কেঁদেই যাচ্ছেন। তারপরও কেনো যেনো এই কান্না আমার মন ছুঁয়ে গেলো না। বরং মহিলাকে প্রতারিত মনে হচ্ছিলো। মহিলার চোখে মুখে একটা হাহাকার ও যেনো লেগে আছে। তা যতটা না সিমির সর্বনাশের জন্য, তারচেয়ে বেশি নিজের জন্য। মহিলার চোখে অবিশ্বাস, রাগ, ঘৃণা, প্রতারণা এবং বঞ্চনার সবগুলো রঙ মিলেমিশে একাকার। কোনোমতেই হজম করতে পারছে না, নাবিদ এই কাজ করেছে। 'এটা ও করতে পারল! তাহলে ও যে বলত, আমাকে ভালোবাসে। বিয়ে করবে। তা সব ফেইক ছিলো? আমার সাথেও তো...!'

একটি কথা, প্রত্যেকটা মানুষ স্বতন্ত্র। প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। তারপরও এই ঘটনায় আমি নাবিদের পাশাপাশি সিমির মাকে দায়ী করব। কারণ নাবিদের সাথে সিমির মায়ের আচরন ছিলো আপত্তিজনক, অগ্রহনযোগ্য। মহিলা জীবন যাপনে ছিলেন অসৎ। তার বৈবাহিক জীবনের অসম্পূর্ণতা সে অনৈতিক ভাবে পূরণ করতে চেয়েছিলো। কিংবা করে আসছিল। ফলে নিজের বিবেকের কাছে সে নত ছিলো। এজন্য মেয়েকে সঠিক শিক্ষাটা দিতে পারেনি। ভালো মন্দ শেখাতে পারেনি। বরং উল্টোটা হয়েছে, মেয়ে তার কাছ থেকে শিখেছে। পরোক্ষ ভাবে। মেয়ের সাথে নাবিদের ঘনিষ্ঠতা সে সহজ করে দেখেছে। ভেবেছে, নাবিদ তাকে ভালোবাসে। কাজেই তার মেয়ে ওর কাছে সেইফ। আর এই সুযোগে নাবিদ নামক কীটরা গাছেরও খায় আবার তলারও কুড়ায়। মানুষ কেনো বোঝে না, যে সম্পর্ক শুরু হয়, অনৈতিক ভাবে সেখানে নৈতিকতা আশা করা বাতুলতা মাত্র।

সিমির মা অবশ্য দায় চাপায় সিমির বাবার উপর। সে নাকি কখনোই এমন পথে যেতো না। স্বামীর উপর প্রতিশোধ নিতেই নাকি সে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে। আহারে বেচারা বাচ্চারা! বাবা মায়ের অসুস্থ্য সম্পর্ক তাদেরকে জীবন্ত নরকে নিক্ষেপ করে কত অবলীলায়!

কথায় বলে, আল্লাহ্‌র মাইর দুনিয়ার বাইর।
প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না এটা যেমন ঠিক, আবার প্রকৃতি অবিচার ও পছন্দ করে না, এটাও ঠিক। প্রকৃতি ঠিকঠাক কড়ায় গন্ডায় শোধ নেয়। আমরা তা বুঝি না অথবা বোঝতে চাই না। প্রকৃতি যে এমন শোধ নেবে, এগারো বছরের একটি মেয়েটির উপর, সেটা সিমির মায়ের কিংবা বাবার হিসাবের বাইরে ছিলো বোধহয়। বেহিসাবি জীবনে যে পাপ তারা করেছে, সে পাপের শাস্তি কড়ায় গন্ডায় তারা পেয়ে যাবে, যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন। আফসোস শুধু সিমির জন্য, বুঝে অথবা না বুঝে একটা চক্রে পড়ে গেলো বাচ্চাটা। এ চক্র তাকে কোথায় নিয়ে ফেলে কে জানে?

৭.
পরিশেষঃ-
পাঠক, খেয়াল করুন, সিমিকে নাবিদ আংকেল বলেছিলো, আদর এভাবেই করতে হয়। এটা তোমার আমার সিক্রেট! এবং মাকে বলতে মানা করেছিল। মা নাকি বিশ্বাস করবে না। বরং সিমিকে খারাপ ভাববে! এই জায়গাটা নোট করুন। লম্পটরা এই সুযোগটাই নেয়। বাচ্চাকাচ্চা ভয় পেয়ে যায়। বাবা মাকে বলতে চায় না। ভাবে, বললে বাবা মা ওদেরই দোষারোপ করবে।

সন্তানকে বলুন, বাবা মা তাকেই বিশ্বাস করবে। তাকে খারাপ ভাববে না। যা কিছুই ঘটুক, বাবা মা তার সাথে থাকবে। তার পাশেই থাকবে। তাকে এটাও বলুন, শিশুদের কোন সিক্রেট থাকতে নেই। সিক্রেট বড়দের ব্যাপার। সব বাবা মাকে জানাতে হয়। সব। বাবা মা তার সন্তানকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, এই কথাটিও সন্তানের মনে গেঁথে দিতে হবে। মনে রাখবেন, আমি কিন্তু সন্তানের কথা বলেছি। শুধু মেয়ে বলিনি। কারণ ছেলে শিশু সন্তানরাও এই বিকৃতরুচির শিকার হতে পারে।

বাচ্চাদের ভালো আদর এবং মন্দ আদর সম্বন্ধে ধারণা দিন। নিজের শরীরটা চেনান। শরীরের প্রাইভেট পার্টস, জেনারেল পার্টস সম্বন্ধে ধারণা দেন। বলেন সাঁতারের পোষাক পরলে শরীরের যে যে অংশ ঢেকে থাকে সেটা প্রাইভেট পার্টস। আর এইসব পার্টসে আদর করাকে মন্দ আদর বলে। এমন কেউ কিছু করলে বাবা মাকে বলতে হয়। চিৎকার করে মানা করতে হয়। প্রয়োজনে হাতের কাছে যা আছে, তা দিয়েই প্রতিরোধ করতে হয়।

আর আমাদের বাবা- মা দের আরো সচেতন হতে হবে।
এমন কোন কিছু করা যাবে না, যা আমাদের সন্তানদের অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা দিয়ে সব মাকে জাজ করা ঠিক হবে না। তবে সংখ্যায় একটি হলেও, এমনটা যে হতে পারে সেটা জানানোই এই পোষ্টের লক্ষ্য।

শুধু সন্তান জন্মদিলেই মা কিংবা বাবা হওয়া যায় না। মা বাবা হতে হলে সন্তানের মঙ্গলের জন্য সব করতে হয়। সব ছাড়তে হয়। প্রতিটা ক্ষণকে সততার আগুনে পুড়িয়ে সন্তানের আইডল হয়ে ওঠতে হয়। সুসন্তান একটা সাধনা। আর সাধনার শুরু হয় মায়ের গর্ভ থেকে কবর পর্যন্ত। সবক্ষেত্রে, সবার ক্ষেত্রে। অতএব সাধু সাবধান।
_____________________________

ডা.ছাবিকুন নাহার
মেডিকেল অফিসার
ঢাকা মেডিকেল কলেজ।


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়