Ameen Qudir

Published:
2018-01-08 07:53:11 BdST

সত্যিকারের গরীবের ভগবান ডাক্তার তিনি


 

 

 


চিত্রদীপ সোম
________________________


একসময় তাঁর বাড়ির কাছাকাছিই থাকতাম। তাঁর ভাগনি ছিলো আমার সহপাঠিনী। সেই সূত্রেও চিনতাম তাঁকে।তার নাম

ডাঃ নিতাই প্রামাণিক।

'গরীবের ভগবান' কথাটি আজ বহু ব্যবহারে ক্লিশে। অনেকক্ষেত্রেই অপাত্রে দান করা হয়। ব্যবহার করা হয় এমন অনেক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যারা তাদের পকেটের টাকা থেকে নয়, বিপুল দু নম্বরী আয়ের বা শোষন করে অর্জিত আয়ের সামান্য কিছুটা অংশ দান করেন গরীবের 'সেবায়', যার পিছনে সেবার মানসিকতা যতটা না থাকে তার চেয়েও বেশী থাকে আত্মপ্রচারের বাসনা।

 

অথচ 'গরীবের ভগবান' যদি কাউকে বলতে হয়, তাহলে তা বলা উচিত এই ডাক্তারবাবুর মতো মানুষদেরই।

ডাঃ নিতাই প্রামাণিক কলকাতা স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের অধ্যাপক-চিকিৎসক। কিন্তু সেই পরিচয় আজ অনেক পিছনে পড়ে গেছে। বর্ধমান শহর সহ এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি আজ 'আমাদের ডাক্তারবাবু', 'ভগবানস্বরূপ'। জীবিতকালেই কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছেন আজ তিনি মানুষের কাছে।

আজকাল যখন বেশীরিভাগ ডাক্তারই মোটা মোটা ফি ছাড়া রোগী দেখেন না, রোগী অপারগ বুঝেও লিখে দেন দামী দামী ওষুধের নাম, হাতে তুলে দেন গুচ্ছের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষানিরীক্ষার তালিকা, স্রেফ ওষুধ কোম্পানী আর প্যাথলজিক্যাল সেন্টারের কাছ থেকে মোটা টাকা কমিশন পাবার আশায়, সেখানে ইনি সবদিক থেকেই এক উজ্বল ব্যতিক্রম।

সক্কাল সক্কাল বর্ধমান স্টেশন থেকে ট্রেন ধরেন তিনি কলকাতার উদ্দেশ্যে। ট্রেন চলতে থাকে, আরে সাথে চলতে থাকে তার বিনিপয়সার 'চেম্বার'। রোগী যত হকার আর ট্রেনের গরীবগুব্বো মানুষজন। কলেজে পড়িয়ে ফের বর্ধমানের বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে বেজে যায় রাত প্রায় নটা। ততক্ষনে তাঁর বাড়ির সামনে লম্বা লাইন। কম করেও শ খানেক লোক। হ্যাঁ, সব বিনি পয়সার পেশেন্ট। কি করা যাবে, ডাক্তারবাবু যে এমনই। কোনোদিনই ফি নেন না গরীবগুব্বো মানুষগুলোর কাছ থেকে। বরং শুধু তাদের সেবা করার জন্যেই সারাদিন কলেজে পড়িয়ে, কলকাতা বর্ধমান দীর্ঘ পথ ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেও বাড়ি ফিরে এতটুকু বিশ্রাম না নিয়েই বসে যান চেম্বারে রোগী দেখতে। অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছলরা যদি হাতে কিছু গুঁজে দেয় তাহলে সেটাই শুধু নেন। তবে তাদের সংখ্যা ওই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শ খানেক রোগীর একজন দুজন বড়োজোর। উলটে ডাক্তারবাবুই দেন ফ্রি স্যাম্পেল। এমন কি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর হাতে গুঁজে দেন শ খানেক বা শ দুয়েক টাকা, ওষুধ ফলমূল কেনার জন্য, এমনটাও শোনা যায় কান পাতলে। রাত দেড়টা অবধি চলে এই বিনাপয়সার রোগী দেখা। তারপর বড়োজোর ঘন্টাপাঁচেক ঘুম। পরদিন সকালে আবার কলকাতার ট্রেন ধরা। এই তাঁর নিত্য রুটিন।

 

দীর্ঘদিন ডাক্তারি করেও আর মেডিক্যাল কলেজে পড়িয়েও তিনি আজ তাই প্রাসাদতুল্য কোনো বাড়ি বানাতে পারেন নি বা কলকাতার কোনো দামী অঞ্চলে ফ্ল্যাট কিনতে পারেন নি। পারবেন কি করে, 'উপরি রোজগার' তো নেইই, প্লাস কলেজে পড়িয়ে যে টাকা পান তাঁর অনেকটাই চলে যায় বরং গরীবের সেবায়। তাঁর বাড়ির অন্দরমহলে আমি ঢুকেছি তাঁর ভাগনির সাথে পরিচয়ের সূত্রে। নিতান্ত ম্যাড়মেড়ে রঙ চটা একটা পুরানো বাড়ি। কেরানীরাও আজকাল এর থেকে ভালো বাড়িতে থাকে। কোনো গাড়িও নেই তাঁর। একটা লজঝরে পুরানো বাইকই সম্বলমাত্র।

 

ডাক্তার হিসাবে তাঁর হাতযশ? সেও আকাশছোঁয়া। বহু ভেলোর ফেরত, বহু বড় বড়ো প্রাইভেট হসপিটাল আর তার গম্ভীরমুখো মোটা ভিজিটের ডাক্তারের কাছে দিনের পর দিন চিকিৎসা করিয়েও রোগের নিরাময় হয় নি, উলটে সর্বস্বান্ত হতে বসেছেন, এমন অনেক রোগীকে নামমাত্র মূল্যের ওষুধের বিনিময়ে সুস্থ করে তুলেছেন তিনি।

বর্ধমান শহর সহ এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভ্যানওয়ালা, রিক্সাওয়ালা, দিনমজুর শ্রেণীর মানুষ আজ তাই তাঁর নাম শুনলেই কপালে হাত ঠেকান, এটা খুবই স্বাভাবিক।

ভালো লাগলো ইটিভি আজ এই মহান মানুষটির কথা সবার সামনে আনলো দেখে। এই পচাগলা সমাজে এদের মতো মানুষদেরই বেশী দরকার আজ।

 

ভালো থাকবেন ডাক্তারবাবু। বহুদিন পরে দেখলাম আপনাকে। তা প্রায় বছর কুড়ি তো হবেই। সেই বিপুল কর্মকান্ড একা হাতে আজও চালিয়ে যাচ্ছেন। এ শুধু আপনাকেই মানায়।

প্রণাম নেবেন। হয়তো আর কোনোদিনই দেখা হবে না। তবু বলি, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আপনার মতো মানুষদেরই আজ আমাদের বেশী বেশী করে প্রয়োজন।


মানুষের জন্য এর জনপ্রিয়