|

দরকার মাত্র ১০০ চিকিৎসক : যারা জবাব দেবে সব নেতিবাচক প্রোপাগান্ডার


Published: 2017-11-20 09:09:42 BdST, Updated: 2017-12-18 20:47:08 BdST

 

ডা. জামান অ্যালেক্স

 


______________________________

#ধন্য_ধন্য_বলি_তারে....
#প্রজেক্ট_১০০
১....
বুকের ব্যথাটা ইদানিং একটু বেড়েছে।গত কয়েকদিন ধরে তাই শুয়ে-বসে দিন কাটাচ্ছি। এরপরও ব্যথাটা চলছে, মনকে ডাইভার্ট করার জন্য বুকশেলফ্ থেকে মহাকাশ সংক্রান্ত একটা বই নিয়ে পড়া শুরু করলাম। অদ্ভুত এক তথ্য আপনাদের জানাই-Boötes void নামে নাকি মহাবিশ্বের একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গা আছে যেখানে মিলিয়ন মিলিয়ন লাইট ইয়ার্সের মধ্যেও কোন গ্যালাক্সি নেই, কেন নেই সেটাও মহাকাশবিজ্ঞানীদের অজানা। কিছু জিনিস অবশ্য না জানাই ভালো, কথায় বলে Ignorance is bliss sometimes....

 

বই পড়া বন্ধ করে নেটে ঢুকতেই Mumbai Mirror এর অনলাইন সংস্করণে খবরটা চোখে পড়লো-"DOCTOR CARRIES PREGNANT PATIENT ON COT FOR 8 KM IN ODISHA".....
ওড়িষ্যার নিতান্ত অজপাড়াগাঁয়ে এক নারী প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণজণিত জটিলতায় মুমূর্ষু অবস্থায় ছিলেন। চিকিৎসক ডা.ওমকার হোতা বুঝতে পারলেন- আর যাই হোক, এ নারীর চিকিৎসা হাসপাতালেই হতে হবে। কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে যাবার পথটা দুর্গম। খাটিয়া বানানো হলো, বিপত্তি বাঁধলো খাটিয়াতে রোগী বহন করে নিয়ে যাবার সময়, খাটিয়া বহন করতে কেউ রাজি হলো না, এতে নাকি সমাজের নিয়ম ভঙ্গ হয়....

 

অবশেষে চিকিৎসক এবং ঐ নারীটির স্বামী দীর্ঘ ৮ মাইল হেঁটে খাটিয়াতে রোগীনিটিকে বহন করে নিকটবর্তী হাসপাতালে আসলে চিকিৎসা শুরু হয়। ১৮ ঘন্টা চিকিৎসার পর জানানো হয় 'Patient is now out of danger'.....
আমি যখন আমার এক জুনিয়রকে ঘটনাটা জানালাম, সে তখন নাকমুখ সিঁটকে বলে উঠলোঃ "খাটিয়া টানা কি ডাক্তারের কাম?"
কামিনী রায়ের কবিতাটি মনে পড়লো, ঐ যে ঐ কবিতাটা---"আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী 'পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে....... " ভাবলাম একবার তাকে কবিতাটা বলি।বলা হয় নাই, কবিতাটা নিশ্চয়ই তারও পড়া......


২....
১৯৭১। পাকিস্তানী হানাদারদের নিষ্ঠুর নির্যাতন চলছিল, বাইরের প্রিন্ট মিডিয়ায় নির্যাতনের কয়েকটা ছবি ছাপা হলো। ছবিগুলো চোখে পড়লো ডা. এড্রিক বেকারের, নিউজিল্যান্ডের অধিবাসী, তিনি তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে মানুষের সেবায় সময় পার করছেন। মনে মনে চিন্তা করলেন যদি সুযোগ হয় তবে আসবেন এদেশে....
তিনি আসলেন, আসলেন সত্যিকারের মানবসেবার ব্রত নিয়ে ১৯৭৯ সালে। সবুজ শ্যামল বাংলা ও বাংলার মানুষকে ভালোবেসে এই দেশেই থেকে গেলেন। জীবনের শেষ ৩২ টি বসন্ত তিনি কাটালেন নিঃস্বার্থভাবে এদেশের মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে....
আমার মাঝে মাঝে বেশ অবাকই লাগে।কি ধরণের মানুষ এরা! আমরা যেখানে কোনরকমে এদেশ ছেড়ে পালাতে পারলে বাঁচি, সেখানে এরা কিসের মায়ায় দারিদ্র্য পীড়িত, রোগ-শোক আর বন্যার দেশকে ও সেদেশের মানুষকে আপন করে নেন! এদের সমস্যাটা কি! এরা কোন ধাতুতে তৈরি!


ডা.এড্রিক বেকারের পরিচিত লোকজন চেষ্টা শুরু করছিলেন যাতে করে নোবেল কমিটির কাছে উনার কর্মযজ্ঞ তুলে ধরা যায়। ডা.এড্রিক অবশ্য সে সুযোগ দেননি, তার আগেই উনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। আমি অবশ্য তাতে খুব একটা দুঃখিত নই। মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় যিনি স্পন্দিত হন, তাঁর নোবেল প্রাইজের প্রয়োজন দেখিনা.....

 

৩.....
এবার এদেশী এক চিকিৎসকের কথা বলি। ডা. মাহমুদুর রশীদ। চিকিৎসকদের একটি গ্রুপে উনাকে নিয়ে লেখালেখি হলে তাঁর সম্পর্কে জানার সৌভাগ্য হয়। তাঁর সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না, আরেকজন চিকিৎসক উনার সম্পর্কে যা বলেছেন আমি নিচে হুবহু সেই কথাগুলোই তুলে দিচ্ছি, এক রূপকথা শোনার জন্য প্রস্তুত হনঃ
"ডা. মাহমুদুর রশীদকে নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করছি।
মানুষটা পাগলা কিসিমের। তার ইচ্ছা হলো তিনি কবিতা লিখতে লেগে গেলেন। রোগী দেখা বন্ধ। জারী গান গাইতে লেগে গেলেন। বিষয়বস্তু কিভাবে মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়। হাটে বাজারে গিয়ে শিল্পকলার শিল্পীদের নিয়ে লিফলেট বিতরন করেন আর জারী গান গাইতে থাকেন যাতে সবাই হাসপাতালে ডেলভারি করায়।
৫০ বেডের হাসপাতালের জন্য যে সুইপার দরকার সেটা ছিলোনা। তিনি হুট করে একদিন গলায় 'আসুন হাসপাতাল পরিস্কার করি'- ব্যানার টানিয়ে ঘুরতে লাগলেন। ইয়া বড় বড় গামবুট, গ্লাভস, ফ্লোর পরিস্কার করার সবকিছু নিয়ে আসলেন।প্রতি রাতে রাউন্ড শেষে তিনি হাসপাতাল পরিস্কার করতে লেগে গেলেন। সাথে সুইপার, এম.এল.এস.এস-দেরও নিতেন।প্রতিবেলা সকালে, রাতে রাউন্ডে যাওয়ার আগে রোগীদের বুঝাতেন- পানের পিক না ফেলতে, খাবারের আবর্জনা ডাস্টবিনে ফেলতে। অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এলো। সুইপাররা আস্তে আস্তে কাজ শুরু করলো।" ইত্যাদি" এসে স্যুটিং করে গেলো। আর উনি ডেকে বেশীরভাগ কৃতিত্ব দিলেন সুইপারদের।


উনাকে ইউ এইচ এফ পিও করে পোষ্টিং দেয়া হল মনপুরা। উনার তখন পিক প্রাকটিস। অনেক বছর ধরে লালমোহন। সংসার, প্রাকটিস রেখে এটা যেনো একটা শাস্তি। আমরা বলাবলি করা শুরু করলাম ডিজি অফিসকে না জানিয়ে মিডিয়ায় যাওয়াতে উনার এই শাস্তি।
কিন্তু উনি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে মনপুরা চলে গেলেন। মনপুরায় কোন ডাক্তার থাকেনা। জীবন ধারনের কোন ফ্যাসিলিটি সেখানে নেই। কারেন্ট থাকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত, লোকাল ব্যাবস্থাপনায়। তিনি দিব্বি সব প্রাকটিস, ফ্যামিলি ছেড়েছুড়ে মনপুরা চলে গেলেন।
হাসপাতালে তখন রোগীরা আসত না। ডাক্তার নেই। ঔষধ নেই। এক্স রে হয়না, ডেলিভারী হয়না। হাসপাতালের ভেতরেই হয় টাকার আদান প্রদান। কিন্তু মনপুরা বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। প্রমত্তা মেঘনা পাড়ি দিয়ে এপারে আসতে কত মা যে মারা গেছে ইয়ত্তা নেই।
তিনি আবার এখানে শুরু করলেন। চিঠি লেখালেখি। সিভিল সার্জন কে বললেন বাধ্যতামূলক ভাবে প্রতি মাসে একজন ডাক্তার পাঠান এখানে, বিদেশী এন জিও দের বললেন ডাক্তার দেন, ডিডি কে চিঠি লিখলেন এমুলেন্স নার্সের জন্য।দূর্নীতি করা সব স্টাফকে ম্যানেজ করে ফেললেন। ডাব পার্টি করে, গল্প করে, কখনো কড়াকড়ি করে।
তিনি কমিউনিটি ক্লিনিক গুলোকে এক্টিভ করলেন।নৌ অ্যাম্বুলেন্স এলো কিছু দিনের মধ্যেই।নার্স নিয়োগে প্রথম প্রায়োরিটি থাকত মনপুরা।


কয়েকদিন আগের বিডি নিউজের খবরে দেখলাম হাসপাতালের ফ্লোরেও রোগীতে ঠাসা। অথচ কিছুদিন আগেও সেখানে সব খাঁ খাঁ করত।"


৪...
হিংসা কোন ভালো জিনিস না। তবে উপরে যাদের কথা বললাম তাঁদের আমি কিছুটা হিংসা করি। মানব কাঠামোর ভেতরে থেকে তাঁরা মহামানবতাকে ধারণ করেন, আমি সেটা পারি না, কাজেই হিংসা তো হবেই....
তবে সবাইকে যে মহামানব হতে হবে ব্যাপারটা কিন্তু সেটাও না। মানুষ হয়ে মানবীয় গুণাবলীর চর্চা তো করাই যায়। সেরকম একটা প্ল্যান করলে কেমন হয়?


৫....
#প্রজেক্ট_১০০ঃ
চিকিৎসক হিসেবে আমাদের প্রত্যেককেই প্রতিনিয়ত কারো না কারো প্রতি সহায়তার হাত সম্প্রসারিত করতে হয়। আমি অবশ্যই এটিকে সমর্থন করি। তবে আমাদের এই সহযোগিতাটি একটি Random প্রসিডিউর, কাকে কোন অবস্থায় আমাদের সাহায্য করতে হবে-সেটি আমরা অনেকেই জানি না, এটা সিচুয়েশন দিয়ে অনেকটা নির্ধারিত। এর একটি সাংগঠনিক রূপ থাকলে মন্দ হয় না...
MBBS ও BDS মিলে এদেশে প্রায় ৮০,০০০ রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসক রয়েছেন, ধরে নিলাম অ্যাকটিভ রয়েছেন ৫০,০০০। আমার ৫০,০০০ চিকিৎসক দরকার নেই। ১০০ জন চিকিৎসক দরকার।
কি করতে হবে? তেমন কিছুই না। শুধুমাত্র কথা দিতে হবে সারাজীবন একটি হতদরিদ্র পরিবারের সকল সদস্যের চিকিৎসার দিকটি আমি দেখব, তাদের কাছে কখনও আমার ভিজিটটি দাবী করব না। ব্যাস, আর কিছু না, এটাই প্রজেক্ট-১০০....
আপনি যদি আরো কিছু করতে চান-সেটা আপনার ব্যাপার, তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটি হতদরিদ্র পরিবারকে স্বাস্থ্যগত দিক থেকে আপনি আগলে রাখবেন-আমার চাওয়া এতটুকুই। সাথে আমাদের নৈমত্তিক সহযোগিতাও চলুক....


৬....
১০০ টি হতদরিদ্র পরিবার আক্ষরিক অর্থে কখনও তাদের চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট ভিজিট নিয়ে চিন্তিত হবেন না--এটা কি আমার খুব বেশী চাওয়া? আমি কি ১০০ জন চিকিৎসক পাবো না?
পত্রিকায় তো আমাদের নিয়ে অনেক খারাপ কথা বের হয়, তাতে যে আমি খুব শঙ্কিত-তা কিন্তু না। আমি বিশ্বাস করি আমাদের কর্মযজ্ঞই হতে পারে এর সঠিক প্রত্যুত্তর। আমি জানি, "Darkness cannot drive out darkness; only light can do that. Hate cannot drive out hate; only love can do that....."
যারা প্রজেক্ট-১০০ এ যোগ দিতে আগ্রহী তারা ইনবক্সে আমাকে জানান, আমি লিস্টটি তৈরি করে রাখবো। চিকিৎসকদের ব্যাপারে অনেক নেতিবাচক কথা আমাদের শুনতে হয়, যখন শুনবেন-তখন ১০০ জন চিকিৎসকের এ লিস্টটি আমি বা আপনি তাদের ধরিয়ে দিব। নেতিবাচক কথাকে ইতিবাচক কাজ দিয়েই থামাতে হয়, ঘৃণাকে জয় করতে হয় ভালোবাসা দিয়েই....

 

৭...
মানব জীবন একটাই, এর সঠিক ব্যবহার আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে।এর কোন বিকল্প নাই, থাকতে পারে না।এ কিন্তু বড় কঠিন কাজ....
তবে সৃষ্টিকর্তা আমার-আপনার প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল বলেই হয়তো আমরা আজ চিকিৎসক। এই সৌভাগ্য সবার হয় না।মানব মনের মন্দিরে প্রবেশ করার যে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা আমাদের আছে সেটাকে কাজে লাগাতে না পারলে এ মানব জন্মের সার্থকতা কোথায়?
এ নশ্বর পৃথিবীতে শত-সহস্র মানুষ আসে, চলে যায়।কিন্তু সত্যিকারভাবে মানবজাতির উপকার করে মানবহৃদয়ে দাগ কাটার ঐশ্বরিক ক্ষমতা সবার থাকে না। আমাদের আছে, সেটাকে কাজে লাগাতেই হবে, তবেই মানুষ হিসেবে আমাদের জন্মলাভ ধন্য হবে....

 

___________________________

ডা. জামান অ্যালেক্স । সুলেখক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।