|

আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখনঃ


Published: 2017-10-12 14:54:07 BdST, Updated: 2017-11-22 09:55:14 BdST

 

 

ডা. জামান অ্যালেক্স
_____________________________________


১...
বেঁচে থাকতে আমার বাবা প্রতিদিন সকালে রুটিন অনুযায়ী রেডিওতে বিবিসি- বাংলার খবর শুনতেন। আমার অবশ্য রেডিও শোনা হয় না, তবে নিয়মিত পত্রিকা পড়া হয়। অনলাইনে না, রীতিমত অফলাইনে, হাতে পত্রিকা নিয়ে খবর পড়তে পারলে তবেই মনে শান্তি পাই....
গতকাল এদেশে এক বড়সড় ঘটনা ঘটে গেছে। প্রায় ৮০,০০০ ছেলেমেয়ে থেকে অত্যন্ত সন্তপর্ণে কিছু ছেলেমেয়েকে বেছে নেয়া হয়েছে, যারা এদেশের ১৬-১৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় একসময় মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। আমার কাছে এটি একটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ খবর। স্পেশাল ইন্টারেস্ট ছিলো- কোন ছেলে বা মেয়েটি প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হলো সেটা জানা, তাদেরকে একটু দেখা।


কোন ইনস্টিটিউট থেকে এরা লেখাপড়া করে এই সাফল্য অর্জন করলো -সেটাও জানতে মনটা খচখচ করছিলো। কাজেই তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মত সকালে ঘুম থেকে উঠেই পেপারটি হাতে নিলাম....
For God's sake, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট পাবলিশ হয়েছে- এই খবরটি আমি পেলাম ৫ম পৃষ্ঠায়, কোণার দিকে, একটি ছোট কলামে। দায়সারা গোছের একটি রিপোর্ট।প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় কারা হলো তাদের সম্পর্কে আমি যে কিছুই জানতে পারি নাই--সেটা বোধ হয় আপনাদের আর না বললেও চলবে....

 

২...
তবে এদেশের মিডিয়া কিন্তু আমি যা জানতে চাই নাই, সেটা বেশ ঘটা করেই আমাকে জানিয়েছে। উদাহরণ দেই.....
মিডিয়া বেশ ঘটা করে আমাকে মুখস্থ করিয়েছে এবার চীনের সানাইয়া শহরে ৬৭ তম মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা হচ্ছে। সেখানে এবার বাঙালি মেয়েরাও বিকিনি পড়ে হাঁটবে। বিকিনি পড়ে হাঁটার টিকিট প্রথমে পেয়েছিলো জান্নাতুল নাঈম। ডাকনাম- এভ্রিল, আগে নাকি 'আমেনা' ছিলো। মিডিয়া আমাকে জানিয়েছে এর বাড়ি চিটাগাং এ, আদর করে একে নাকি 'মাফিয়া গার্ল' নামেও ডাকা হয়। মিডিয়াকে এই মাফিয়া গার্ল নিয়ে কয়দিন বেশ আহা উঁহু করতে দেখলাম....
জানতে না চাইলেও এই মিডিয়াই আমাকে কয়দিন পর জানালো 'এভ্রিল ওরফে আমেনা' নাকি ফ্রড। নতুন মিস বাংলাদেশ - জেসিয়া ইসলাম। মিডিয়ার কল্যাণে আমি এখন এও জানি নতুন মিস বাংলাদেশের উপরের পাটির কোন দাঁতটা বাঁকা....


৩.....
প্রায় ৮০,০০০ ছাত্রছাত্রীকে পেছনে ফেলে দীর্ঘ ১২ বছরের সাধনায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় যারা প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হলো তাদের মুখটা আমাকে মিডিয়া চেনায় না, মিডিয়া তাদেরকে প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু ২৫,০০০ মেয়ের মাঝে কমপিটিশন করে যে বা যারা চীনে গিয়ে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিকিনি পরে হেঁটে, অপসংস্কৃতির ঝান্ডা বহন করে দেশের সম্ভ্রমকে বিশ্বের দুয়ারে বিকিয়ে দিয়ে আসবে --মিডিয়া আমাকে তাদের নাম মুখস্থ করায়!
অদ্ভুত দেশ, অদ্ভুত তার রীতিনীতি, অদ্ভুত সেই দেশের মিডিয়ার কাজকারবার...
৪....
মিডিয়া অবশ্য লেখাপড়ার মূল্য না বুঝলেও ব্যবসাটা কিন্তু ভালোই বুঝেছে। ব্যাখ্যা দেই.....
কোন এক কোচিং সেন্টার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছেলেটিকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি বিজ্ঞাপন পত্রিকায় দিয়েছে। সেটার কিন্তু ঠাঁই হয়েছে পত্রিকাটির তৃতীয় পৃষ্ঠায়। তৃতীয় পৃষ্ঠায় পত্রিকাগুলো বিজ্ঞাপন কিন্তু এমনি এমনি ছাপায় না। গুড, I mean, at the end of the day- Money matters...
পার্ট টাইমে এই মিডিয়াগুলো কতই না নীতিনৈতিকতার বুলি আওড়ায়!


৫...
একটু অন্যদিকে দৃষ্টিপাত করি। দেশে বা বিদেশে আমাদের ক্রিকেট টিম ভালো খেললে মুহূর্তের মাঝে আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিরা তাদের অভিনন্দন জানানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। কর্তাব্যক্তিরা এদের মাথায় স্নেহে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন --সেটাও পত্রিকা মারফত আমাদের চোখে পড়ে। আমার তাতে আপত্তি নেই....
তবে আমাদের মমতাময়ী প্রাইম মিনিস্টার কিংবা গ্রামের মাটি-বাতাস-হাওড়কে ভালোবাসা আমাদের রাষ্ট্রপতি কি একবারো মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হওয়া ছেলেমেয়েগুলোকে ডেকে একটু কথা বলবেন? তাদের মাথায় প্রগাঢ় মমতায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তাঁরা কি একবারো বলবেন-- " তোমরা এদেশের সম্পদ, এদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে তোমাদেরকেই গড়ে তুলতে হবে"?
প্রিয় মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী বা আমাদের অভিভাবক রাষ্ট্রপতি- আপনাদের বলি, একবার এই কাঁচামনের ব্রিলিয়ান্ট ছেলেমেয়েগুলোকে ডেকে উপরের কথাগুলো বলে দেখুন, আমি হলফ করে বলতে পারি এরা বড় হয়ে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েও এদেশে থেকে এদেশের মানুষের সেবা করে যাবে, বিদেশে পাচার হবে না, স্বপ্নের সোনার বাংলা এরাই গড়ে তুলবে....


৬...
আচ্ছা, একটা কাজ কি করা যায় না? মেডিকেল বা বুয়েট বা ঢাকা ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম যে ১০ জন ছেলেমেয়ে মেধাতালিকায় অবস্থান করে -তাদের নিয়ে কি কোন টিভি চ্যানেলে কোন একটি অনুষ্ঠান দাঁড় করানো যায় না?
একটা অনুষ্ঠান কি দাঁড়া করানো যায় না-যেখানে বুয়েট-মেডিকেলে বা ঢাকা ভার্সিটিতে সদ্য চান্স প্রাপ্ত এই মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো হবে অনুষ্ঠানটির কেন্দ্রবিন্দু? তারা সে অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হিসেবে অবস্থান করবে, তাদের অনাগত জীবনকে গাইড করার জন্য সেখানে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার থাকবেন, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার থাকবেন, মেডিকেল বা বুয়েটের বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থেই কর্মের মাধ্যমে সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় যে স্যার বা ম্যাডামরা আছেন--তাঁরা থাকবেন। তাঁরা তাদের জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের গল্প সে মেধাবী ছেলে মেয়েদের শোনাবেন, যে মানবিক গল্পগুলো লাইভে তাদের সাথে সাথে এদেশের লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েরা শুনবে। একটা অনুষ্ঠান কি তৈরি করা যায়না যেখানে এই মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো তাদের সংগ্রামের কথা বলবে, সাফল্যের পেছনের বিনিদ্র রজনীগুলোর কথা আমাদের জানাবে, তাদের অভিভাবকদের ডেডিকেশনের কথা আমাদের কাছে তুলে ধরবে?
এরকম একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করা কি খুব কঠিন কিছু? আমি নিশ্চিত- এরকম একটি অনুষ্ঠানের জন্য এদেশের লক্ষ লক্ষ কিশোর কিশোরী কিন্তু অপেক্ষা করে বসে আছে...
শুধুমাত্র এরকম একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে পুরো নেক্সট জেনারেশনকে পজিটিভলি ডাইভার্ট করে ফেলা যায়।একটি দেশের ভবিষ্যত পরিবর্তন করে ফেলা যায়। অনুষ্ঠানটির ইমপ্যাক্ট হতো অনেক গভীর, শত শত ছেলেমেয়ে অনুপ্রাণিত হতো, দেশকে গড়ার কাজে এরা এদের মেধাকে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ হতো....
আফসোস, আমরা তাদের জন্য এধরণের কোন আইকনিক অনুষ্ঠান তৈরি করতে পারি নাই। আমরা টিআরপি বাড়ানোর জন্য নগ্নতাকে পুঁজি করে ঠুনকো অনুষ্ঠান তৈরি করি, সেই অনুষ্ঠান তৈরি করে জাতিকে নগ্ন হতে শেখাই, মিথ্যুক হতে উৎসাহিত করি, নেক্সট জেনারেশনকে ধোঁজাবাজ হতে আমরা প্রণোদনা দেই, ওভারঅল একটি জাতিকে আমরা মিসগাইড করি...
৭....
আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন-- গানটি আমার খুব প্রিয়। গানটি মনে হলেই মানসপটের আয়নায় রূপসী, সতত বাঙালি এক ললনার ছবিকে আমি প্রতিফলিত হতে দেখি....
তবে আয়নাতে যে সবসময় শুধুমাত্র নায়িকার চেহারাকেই ভাস্বর হয়ে উঠতে হবে - এমন কিন্তু নিয়ম নেই। প্রতিটি জাতিরও কিন্তু একটি মনের আয়না আছে, সেই আয়নায় প্রতিটি জাতি কিন্তু নিজেকে দেখতে পায়....
মেধাহীন, বিবেকবর্জিত, অপসংস্কৃতির আতিশয্যে, মিথ্যার বেসাতি ছড়িয়ে, ঠুনকো জিনিসকে উৎসাহিত করে যে অদ্ভুত জাতি আমরা বিনির্মাণ করে চলেছি-কেমন হবে মনের আয়নায় সে জাতিটিকে দেখতে? জাতির কল্পিত কদর্য সে মুখশ্রী দেখতে আমরা সবাই প্রস্তুত তো?....


____________________________

ডা. জামান অ্যালেক্স, সুলেখক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।