|

ধর্ষণ: প্রতিকার ও প্রতিরোধে করনীয়


Published: 2017-09-21 11:48:40 BdST, Updated: 2017-10-22 05:18:22 BdST

 

 

 


প্রফেসর ডা. মো. তাজুল ইসলাম

________________________________

 

দেশে ধর্ষণ যেন থামছেই না।ধর্ষনের " তুফান" তুফান গতিতে অব্যাহত রয়েছে। আইন ও শালিস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষনের সংখ্যা ২৮০ জন,এর মধ্যে ধর্ষনের কারনে মারা গেছে ১০ জন ও ধর্ষনের কারনে আত্মহত্যা করেছে ৫ জন।অন্যদিকে শিশু ধর্ষনের হার প্রাপ্ত বয়স্কদের চেয়ে ৩ গুন বেশি। আফ্রিকায় এরকমটি অনেকটা মহামারি আকার ধারন করেছে।সে জন্য সেখানে ধর্ষনের শাস্তি প্রকাশ্যে গলা কর্তন এবং ক্ষেত্র বিশেষে ধর্ষককে হাত বেধে উপরে ঝুলিয়ে রেখে অন্ডকোষে বড় পাথর বেধে ঝুলিয়ে রাখা।


ধর্ষনের শ্রেনি বিভাগ:
পরিস্হিতি অনুযায়ী :অভিসার/ দাওয়াত ধর্ষন; শিশু ধর্ষন; দলবদ্ধ ধর্ষন; পরিচিতজন দ্বারা ধর্ষন; দাম্পত্য ধর্ষন; পরিবারের লোক দ্বারা ধর্ষন- ইত্যাদি
লক্ষ্য অনুযায়ী :ক্রুদ্ধ ধর্ষক( এনঙ্গার রেপিস্ট); ক্ষমতা দেখানো ধর্ষক( পাওয়ার রেপিস্ট); পীড়নকারী ধর্ষক( সেডিস্ট রেপিস্ট)।
ধর্ষকের কিছু বৈশিষ্ট্য :শিশুকাল থেকে ছোট - বড় অপরাধের ইতিহাস থাকে; এরা যৌন ও শারিরিক নির্যাতনের শিকার ; এরা প্রায়শ ভাঙ্গা সংসার/ অকার্যকর সংসার থেকে আগত; এরা বাউন্ডেলে,উচ্ছৃঙ্খল, বখাটে স্বভাবের; এদের বিবেক তৈরী হয় না বা হলেও ক্রটিপূর্ন;অপরাধ করে অনুতপ্ত হয় না; নিষ্ঠুর, নির্মম মানস গঠনের; এরা নিয়ন্ত্রণহীন পশুর মতন।
ধর্ষনের মনস্বতাত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ জরুরী তবে বর্তমানে তারচেয়ে বেশী জরুরি ধর্ষন প্রতিকার ও প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহন।
সকল প্রকার সতর্কতা ও সাবধানতা সত্বেও আমরা হয়তো ধর্ষন পুরোপুরি প্রতিরোধ করতে পারবো না,তবে সচেতনতা,সতর্কতা ও সামাজিক- আইনি প্রতিকার এ সংখ্যা অনেক কমিয়ে আনতে পারে।


প্রতিরোধের জন্য ওই নারীকে এভাবে ক্ষমতায়িত করতে হবে যেন তারা দৃড়ভাবে বিশ্বাস করতে শিখে যে " না" বলার ও " আত্ম রক্ষার" অধিকার ও সক্ষমতা তার রয়েছে।নারী ধর্ষনের প্রধানতম অনুসঙ্গ হচ্ছে সকল যৌনতার প্রতীক নারীতে আরোপ করার সমাজ- সাংস্কৃতিক প্রবনতা।শুধু মাত্র নারীকে " সেক্সুয়ালাইজড" করার এই ধারাকে প্রতিহত করতে হবে।নারীকে" মানুষ" নয় " সেক্স" হিসেবে ভাবার পুরুষতান্ত্রিক দৃস্টিভঙ্গির আমুল পরিবর্তন করতে হবে।

 


প্রতিরোধের উপায়: প্রথমেই প্রয়োজন ধর্ষন সংস্কৃতিকে উচকে দেয়,প্রশ্রয় দেয় তেমন সমাজকে ধর্ষন বিরোধী, ধর্ষন প্রতিরোধী সমাজে রূপান্তর করা।এর জন্য গল্প,উপন্যাস, নাটক,সিনেমা,বিজ্ঞাপনে নারীকে "যৌন পন্য" হিসেবে আকর্ষণীয় ভাবে উপস্হাপন বন্ধ করতে হবে।নারীকে " সেক্সুয়ালাইজড" করার কালচার বদলে ফেলে তাকে" মানুষ" হিসেবে ভাবার সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে।
অন্য দিকে সমাজে যে সব মিথ,বিশ্বাস ধর্ষনকে প্রশ্রয় দেয় তেমন মিথগুলোকে ভেঙ্গে দিতে হবে।তেমন কিছু প্রচলিত মিথ হচ্ছে: নারীর উগ্র পোষাক,চাল- চলন ধর্ষনকে উৎসাহিত করে; নারী ধর্ষিতা হতে চায়; নারীর বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না,তাই তাকে বার বার " আহ্বান " জানাতে হবে; পুরুষরা অধিক যৌন- কাতর,তাই তারা নিজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; ভূমি দস্যুদের মতন এই যৌন দস্যুদের মানসিকতা এই যে নারীর দেহের উপর সে "অধিকার প্রাপ্ত"( এনটাইটেলমেন্ট); একবার শারিরিক সম্পর্ক হওয়া মানে পরবর্তীতে ও সে অধিকার থাকবে; রাত- বিরাতে নারীর একাকী চলাফেরা ধর্ষনের অন্যতম কারন; ধর্ষিতার শরীরে আঘাতের চিন্হ নেই,তাই তার নীরব সমর্থন ছিল- ইত্যাদি ভ্রান্ত বিশ্বাস সমাজ থেকে দূর করতে হবে।

 

এছাড়া ও ধর্ষন সংস্কৃতি পরিবর্তনে আরো যা যা করতে হবে: ধর্ষন প্রতিরোধে শুধু নারীকে সতর্ক থাকতে বললে হবে না,পুরুষকে ও " ধর্ষন করবে না" এই বার্তা বার বার দিতে হবে; পরিবার, সমাজে অন্যের " অনুমতি/ সম্মতি" নেওয়ার ( কনসেন্ট)কালচার তৈরী করতে হবে; প্রচার মাধ্যম,ভিডিওতে যৌন সুরসুরি দেওয়া প্রোগ্রাম বন্ধ করতে হবে; পৌরুষত্বের সনাতনী ধারনায় পরিবর্তন আনতে হবে; ধর্ষন " প্রাকৃতিক" ব্যাপার এ ভুল ধারনা ভেঙ্গে একে " অপরাধ " ও নারীর প্রতি " সহিংসতা " হিসেবে দেখতে হবে; ধর্ষন মানে ধর্ষন, প্রেম - বন্ধুত্বের নামে একে " বৈধতা" দেওয়ার চেষ্টা করা যাবে না; চোখের সামনে ধর্ষন হচ্ছে অথচ নির্বিকার, নিষ্ক্রিয় থাকার কাপুরুষতা পরিহার করতে হবে; সামাজিক / আইনগত হয়রানি, অসম্মানের ভয়ে ধর্ষনের ঘটনা লুকিয়ে রাখা যাবে না;- ইত্যাদি ।

 

সম্ভাব্য ভিকটিমদের করনীয় :আপনি কোথাও বা কারো কাছে নিরাপদ কিনা সে ব্যাপারে নিজের অন্তর্জ্ঞান( ইনটুইশন) ও মন যা বলে সেটিকে গুরুত্ব দিন; চার- পাশের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখুন; তেমন কিছু সঙ্গে রাখুন যা প্রয়োজনের সময় অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কাজে লাগবে( হুইসেল,এলার্ম); আত্মরক্ষার কৌশল শিখুন; রাস্তায় হাটার সময় নির্জন, পরিত্যক্ত এলাকা এড়িয়ে চলুন ; সঙ্গে মোবাইল ফোন রাখুন; আত্মবিশ্বাসী, সাহসী মনোভাব রাখুন; মোবাইলে " কোড ওয়ার্ড" রাখুন, যাতে বিপদের সময় সাঙ্কেতিক ভাবে পরিবারের লোক/ বন্ধুদের জানাতে পারেন; ফলো করছে মনে করলে পাশের বাড়ীতে ঢুকে পড়ুন; পার্টিতে দল বেধে ও বিশ্বস্ত লোক নিয়ে যাবেন ; সেখানে মদ খাবেন না; বিপদ আচ করলে কোন এক ওছিলায় বের হয়ে আসার চেষ্টা করুন।যদি একান্তেই আক্রমনের মুখে পড়ে যান: স্পস্ট ও দ্যর্থহীন ভাষায় নিজের অবস্হান পরিষ্কার করুন; এটি ধর্ষন স্মরন করিয়ে দিন; কোড ওয়ার্ড থাকলে ব্যবহার করুন ; কোন অজুহাত দাড় করান( পিরিয়ড চলছে বা যৌনবাহিত রোগ রয়েছে); অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য চিৎকার করুন,নখ দিয়ে খামচে ধরুন,চুল ধরে হেচকি টান দিন; কামড় দিন,লাথি, ধাক্কা দিন- এভাবে কোন রকমে নিজকে ক্ষনিকের জন্য মুক্ত করতে পারলে দৌড়ে পালিয়ে আসুন; সরাসরি পুলিশের কাছে যাবেন,হাত ধুবেন না বা এমন কিছু করবেন না যাতে শারিরিক আলামত নষ্ট হয়ে যায়।যদি ছুরি বা আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে দাড়ান: আপনার বাধা তাকে আরো হিংস্র করতে পারে,তাই যদি আক্রমন করতেই চান তা হতে হবে- অপ্রত্যাশিত,হঠাৎ ও খুবই কষ্টদায়ক ( বিশেষ করে তার অন্ডকোষ,চোখের কোটর,শ্বাসনালীকে টার্গেট করতে হবে)।

 

সমাজ ও রাস্ট্রীয় উদ্যোগ: ব্যক্তিকে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে ঠিক,তবে ধর্ষন প্রতিরোধে মূল দায়িত্ব নিতে হবে সমাজ ও রাস্ট্রকে।আমেরিকায় সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল ( সিডিসি) কেন্দ্রীয় ভাবে " রেপ প্রিভেনশন এন্ড এডুকেশন "( আর,পি,ই) প্রোগাম চালু করেছে।
এ ধরনের জাতীয় প্রোগ্রাম আমাদের ও নিতে হবে,যেখানে পৃথিবী ব্যাপী পরিক্ষিত ও বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত কার্যকর " প্রতিরোধ " প্রোগ্রাম গুলো বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।বৈজ্ঞানিক গবেষনায় কার্যকর প্রমানিত এমন ৩ টি প্রোগ্রাম হচ্ছে: ১) সেইফ ডেট- এতে ৫টি উপাদান রয়েছে এবং কিশোরীদের আবেগগত ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে এটি সফল বলে প্রমানিত। ২) শিফটিং বাউন্ডারিজ: ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্ষন প্রতিরোধী মনোভাব তৈরীর চেষ্টা নেওয়া হয়।৩) রিয়েল কনসেন্ট- সামাজিক অনুধাবন ও সামাজিক আদর্শকে ব্যবহার করে সমাজমুখী,নৈতিক আচরন তৈরীর চেষ্টা নেওয়া হয়।
এ ছাড়াও আরো ৪ টি প্রোগ্রামকে " প্রতিশ্রুতিশীল " বলে গন্য করা হয়- ১। গ্রীন ডট প্রোগ্রাম - ডরোথি এডওয়ার্ড প্রবর্তিত এ প্রোগ্রামে সামাজিক মান দন্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা ও ধর্ষনের কাছে থাকা জনগনকে প্রতিরোধে এগিয়ে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।২। ম্যান'স প্রোগ্রাম - জন ফুবার্ট প্রবর্তিত এ প্রোগ্রামে অন্যকে সম্মান করা,সম্পর্ক উন্নত করাসহ ভিকটিমের প্রতি সহমর্মি( এমপ্যাথি) হওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়।৩। ধর্ষনের পার্শস্হজনদের প্রো- একটিভ ভূমিকা নিতে উদ্বুদ্ধকরণ - ভিক্টোরিয়া বেনিয়ার্ড প্রত্যক্ষ দর্শীরা কখন,কিভাবে সহায়তায় এগিয়ে আসবেন সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য এ প্রোগ্রাম তৈরী করেন।৪। এস এস: এস এসটিপি- প্রোগ্রাম।
আইনি সংস্কার : রেপ শিল্ড 'ল অনুসরন করতে হবে,যাতে ভিকটিমকে অনাবশ্যক ক্রস এক্সাম না করা হয়,ব্যক্তিগত বিষয় বেশি প্রকাশ্যে আনা না হয়;তার অতীত যৌনতাকে উদাহরন হিসেবে টানা না হয়;অধিকতর প্রমানের বিধান রহিত করতে হবে; মেডিকেল পরিক্ষায় স্টান্ডার্ড প্রোটেকল মেনে চলতে হবে,অভিজ্ঞ প্রফেশনাল দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে,সব কিছুর ডকুমেন্টেশন রাখতে হবে,কোন চাপ,দুনীতির যেন অবকাশ না থাকে; ধর্ষকদের পূর্ন জীবন বৃত্তান্ত রেজিস্ট্রি করে তা সব জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে,ইন্টারনেটে তা প্রাপ্তির সুযোগ থাকতে হবে এবং কঠোর শাস্তির জন্য আইনি সংস্কার আনতে হবে- কয়েকটি দেশের ধর্ষনের শাস্তি এরকম: ভারত( ২০১৩ এর সংশোধিত আইন অনুযায়ী) - যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা আমৃত্যু কারা দন্ড; ফ্রান্স- ১৫-৩০ বছর জেল;চীন- ঘাড়ে গুলি করে মৃত্যু দন্ড; আফগানিস্তান - ৪ দিনের মধ্যে মাথায় গুলি করে মৃত্যু ; এছাড়া ন্যুনতম সাজার উল্লেখ থাকতে হবে; বিচার দূ্রুত ও শাস্তি দৃশ্যমান করতে হবে।
শেষ করছি এক বিদেশি ধর্ষিতা নারীর উক্তি দিয়ে" আমার এ ক্ষত প্রকৃত পক্ষে নিরাময় হতে শুরু করে তখন,যখন আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম যা ঘটেছে তার জন্য আমি দায়ী নই"। ধর্ষনের মতন ঘৃন্য, কুৎসিত কাজের শিকার যে সব মা- বোন তাদের সে আবেগগত ক্ষত নিরাময়ে আমরা সাহায্য করতে পারি তাদেরকে আরো অসম্মান, হয়রানি,অপমানিত না করে, তারা পবিত্র, নিষ্পাপ ও দায়মুক্ত এই আস্হা,বিশ্বাস তাদের মনে ফিরিয়ে এনে তাদের আত্মসম্মান বোধকে চাঙ্গা করতে পারলে।

____________________________________


প্রফেসর ডা. মো. তাজুল ইসলাম
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
কমিউনিটি এন্ড সোশাল সাইকিয়াট্রি বিভাগ, জাতীয় মানসিক স্বাস্হ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
ই- মেইল:drtazul84@gmail.com

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।