|

চিকিৎসকদের ললাটে শত সহস্র বর্ষের যে জয়তিলক , তা এসব চিকিৎসকের জন্যই


Published: 2017-09-19 10:41:09 BdST, Updated: 2017-10-22 05:19:39 BdST

 


ডা. জামান অ্যালেক্স

____________________________________

 

তোমাদের_জন্য_ভালোবাসা
প্লট_১
______________

ভদ্রলোকের চেহারায় বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। উসখুশ করছেন। আমি চেহারায় হাসি হাসি ভাব ধরে রেখেছি। শাহীন সাহেব আমার চেম্বারে এর আগেও উনার শারীরিক সমস্যার জন্য এসেছেন, আমার চিকিৎসায় তার কোন উন্নতি হয়নি। নিউরোলজীর অধ্যাপকের কাছে রেফার করেছিলাম। তার মাথা ব্যাথা আরো বেড়েছে। আমি কথা শুরু করলাম।
--শাহীন সাহেব, আমি জানি আপনি আমার উপর রাগ করে আছেন। আপনার রোগটা আমি ধরতে পারছি না। আমার সীমাবদ্ধতা আছে।
--আমি জানি
--যদি জানেন তবে আমার সামনে বিরক্ত ও মন খারাপ ভাব নিয়ে থাকবেন না।
শাহীন সাহেব তার কুঞ্চিত ভ্রু কিছুটা সোজা করে তার হাতে রাখা প্যাকেটটা আমার টেবিলের উপর রাখলেন।
--কি এটা?
--কবিতার বই
--কার লেখা?
--আমার। আমি ডাক্তারদের অপছন্দ করি, তবুও আপনাকে গিফট্ করলাম।
--আপনি কবিতাও লিখেন নাকি!
--হুম, আমার আরও বই আছে।
--শুনে খুশি হলাম। একটা প্রশ্ন করতে চাচ্ছি, আমি তো আপনার রোগ ধরতে পারিনি, ডাক্তারদেরও অপছন্দ করেন, তবে এই বই আমাকে গিফট্ করলেন কেন?
উনি চুপ করে রইলেন, একটু পর বললেন, আজ যাই....
উনি চলে গেলেন। তবে বাহ্যিকভাবে ডাক্তারদের অপছন্দ করা এই ব্যাক্তি যাবার আগে নিঃশব্দে রেখে গেলেন "তোমাদের জন্য ভালোবাসা"....

 

# প্লট_২
২৪ ঘন্টা ইমার্জেন্সী ডিউটি চলছিলো। রাতে ক্ষুধায় ছটফট করছি। সাধারণত ডিউটিতে আসার সময় আমি কোন খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আসি না, অতিরিক্ত হাঙ্গামা লাগে, তাছাড়া বাসার পরিবেশ পরিস্থিতিও অনুকূল না। এককাপ চা খাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হব। এমন সময় দরজায় টোকা পরলো। দরজা খুলে দেখি মিরাজ ভাই, উনি স্থানীয়, উনার মা আমার পেশেন্ট। দুই হাতে দুই টিফিন ক্যারিয়ার।
--কি ব্যাপার মিরাজ ভাই?
--স্যার, সকালে দেখলাম আপনি ইমার্জেন্সী ডিউটিতে আসছেন, দেইখা আমি বাজার করলাম। আমি জানি আপনি খাওয়া দাওয়া নিয়া আসেন না। বাসায় গিয়া বউরে বললাম, ভালোমত রান্না কর, আজকে স্যাররে খাওয়ামু। এখন এইসব খান স্যার। গরীব মানুষ, বেশী কিছুর ব্যবস্থা করতে পারি নাই।
বেশ ক্ষুধার্ত ছিলাম, রক্তের সম্পর্কহীন এক লোকের এহেন ভালোবাসায় চোখে পানি চলে আসলো।
আমি আর আমার ড্রাইভার মিলে ভরপেট খেলাম। গরীবি হালতের নমুনা দেখলাম, আইটেম ছিলো ১৪ টা!!
খাওয়া শেষে বললাম, 'ভাবীকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন, এতগুলা আইটেম....'
মিরাজ ভাই বললেন, "আপনারা ডাক্তাররা আমাগো জন্য কত করেন। আমরা এতটুকু করতে পারমু না!"

 


# প্লট_৩
আমার চেম্বার ও হাসপাতালে এক মোটাসোটা মহিলা প্রায়ই আসেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বয়স ৫০ এর কাছাকাছি। উনার ভাষ্য অনুযায়ী, উনি কোন এক বিশেষ কারণে আমাকে খুবই পছন্দ করেন।
বিশেষ পছন্দের নমুনা দেই-- উনি উনার যেকোন রোগের কথা বলা শুরু করুক না কেন, কথা এক সময় উনার রোগ থেকে ৩০-৩৫ বছর পূর্বে উনার বাসর রাতের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় গিয়ে থামে, "বুঝলেন স্যার, তখন আমার শরীরে ভরা যৌবন...."
আমি আতঙ্কগ্রস্ত হই, কথা ঘুরানোর চেষ্টা করি, লাভ হয়না, নিরুপায় হয়ে উনার ভরা যৌবনের রগরগে বর্ণনা শুনতে হয়।
এই চটুল মহিলা হঠাৎ নিরুদ্দিষ্ট হলেন, আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কয়েকমাস পর চেম্বার শেষ করে উঠতে যাব, এমন সময় উনি ঢুকলেন। ঢুকেই বললেন, স্যার, আমারে বাঁচান।" চেহারা দেখে বুঝলাম, Toxic face, ঘোরতর রোগ শরীরে বাসা না বাঁধলে এমন চেহারা হয় না। ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস -নিউমোনিয়া (CAP), প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট দিলাম, হাসপাতালে ভর্তি হতে বললাম....
সপ্তাহখানেক পর উনি আবার আমার চেম্বারে আসলেন, আল্লাহর রহমতে বেশ সুস্থ। চটুল এই মহিলা ওইদিন কোন কথা বললেন না, বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলেন। যাবার আগে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "আপনি আমার ছেলের মত, আপনার জন্য আমি দোয়া করলাম"।
আমি সেইদিন সত্যিকার অর্থেই তার চোখে আমার জন্য মাতৃত্ববোধ এবং ডাক্তারদের জন্য মমত্ববোধ দেখেছিলাম.....
আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যায়, প্রয়োজন দেখি না। আমি জানি, ডাক্তার-পেশেন্ট রিলেশনশিপের এই চরম দুর্দিনেও বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য ডাক্তার প্রতিনিয়ত এরকম ঘটনার জন্ম দিচ্ছেন। চিকিৎসকদের ললাটে শত সহস্র বর্ষের যে জয়তিলক আজ শোভা পায়, তা এসব চিকিৎসকদের জন্যই....
একজন ছেলে বা মেয়ে এমবিবিএস পাশের পর এক অসীম অদৃশ্য ক্ষমতার অধিকারী হয়, তা হলো মানুষের কষ্ট লাঘব করার ক্ষমতা, দ্রুত মানুষের কাছে যাওয়ার ক্ষমতা, দ্রুত মানুষের ভালোবাসা অর্জন করার ক্ষমতা। এ ক্ষমতা হেলাফেলা করার মত না। এ ক্ষমতা অন্য কোন প্রফেশনে নেই। # আবুল_বাজনদার ( Tree man) সাক্ষাতকারে তার সন্তানকে চিকিৎসক বানাবেন বলেছেন। বুঝে নিন চিকিৎসকদের ক্ষমতা কতটা তীব্র !! শুনেছেন কখনও কোন পিতা মোটিভেটেড হয়ে পেপারে বা টিভিতে সাক্ষাতকারে বলেছেন, 'আমি আমার সন্তানকে পুলিশ বানাবো, বা ইঞ্জিনিয়ার বানাবো বা আইনজীবী বানাবো'? আমি শুনিনি।
ইরানের এক ছোট শহর জাভানরুদ। এই শহরের লোকগুলো আজ একটি বাসায় ভিড় জমিয়েছে, কেউ কাঁদছেন, কেউবা বিলাপ করছেন। যার জন্য লোকগুলো কাঁদছেন, উনি বাঙালি, ইরান ছেড়ে মাতৃভূমির কোলে ফিরে আসছেন, সন্তানকে মাতৃভূমির আলো-বাতাসে শিক্ষিত করে গড়ে তুলবেন এই তাঁর আশা। শহরের লোকগুলো মন থেকে বিদায় দিতে না চাইলেও ভদ্রলোকের জাগতিক প্রয়োজনের কাছে তারা হার মানেন। তবে ভদ্রলোকের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকে শহরের লোকগুলো করেছিলো রাজসিক, তাঁর গাড়িকে এসকর্ট করেছিলো বিষাদগ্রস্ত লোকগুলোর অসংখ্য গাড়ি। ঘটনাটি ২২ বছর আগের।ভদ্রলোক পেশায় চিকিৎসক ছিলেন....
সমস্যাটা হলো, এই যে চিকিৎসকদের এত ক্ষমতা (অবশ্যই পজিটিভ অর্থে) তা বেশ কিছু চিকিৎসক Exercise করেন না। কেউ কেউ আমাকে বলেন," ভাই, বাঙালি লোক খারাপ, এদের সাথে ভালো ব্যবহার করে লাভ নেই"। আমি দ্বিমত পোষণ করি। আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসা ফেরত আসবেই....
Henry Wadsworth Longfellow এর "#The_Arrow_and_the_Song" কবিতাটি আমার খুব প্রিয়। এর থিমটি অসাধারণ-- যে যেমন আচরণ করবে, তার কাছে তাই ফিরে আসবে....
এক একটা সাধারণ মানুষ এক এক জন ভালোবাসার ফেরিওয়ালা, ভালোবাসার ডালি খুলে তারা বসে আছেন। তারা ভালোবাসা দেয়ার জন্য প্রস্তুত। আপনি কি নিবেন তাদের এই ভালোবাসা? যদি না নিতে পারেন তবে তার দায় দায়িত্ব আপনারই। ২০০২ সালে রিলিজ হওয়া Spider-man মুভিটির শেষ ডায়ালগটি কি আপনাদের মনে পড়ে? না পড়লে আমি মনে করিয়ে দেই-- "With great power comes great responsibility. This is my gift, my curse."....

________________________________


ডা. জামান অ্যালেক্স । পাঠকপ্রিয় সুলেখক। লোকসেবী চিকিৎসক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।