|

ডাক্তার দিয়েছেন Vigor Ace মাল্টিভিটামিন, ফার্মেসীর দোকানদার বেচেছে যৌন বর্ধক Vigorex


Published: 2017-01-11 14:59:05 BdST, Updated: 2017-06-25 21:27:41 BdST

 

ডা. জামান অ্যালেক্স

_______________________________


যদি কিছু মনে না করেন ।

খিলগাঁতে "ঠান্ডা-গরম" নামে একটা জুসের দোকান আছে।নরমাল বিভিন্ন রকম ফলের জুসের সাথে অদ্ভুত কিছিমের ফলের জুসও এখানে পাওয়া যায়। সেরকম এক জুস হলো -'ডেউয়ার শরবত'।

পার্সেল করে বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। স্ট্র দিয়ে খেতে খেতেই খবরটা নজরে পড়লো......

১. প্রেসক্রিপশন স্পষ্টভাবে বা বড় অক্ষরে বা ছাপানো আকারে দিতে চিকিৎসকদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সার্কুলার জারির নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত....

২. প্রেসক্রিপশনে জেনেরিক নাম লেখার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সে ব্যাপারে আদালত রুল জারি করেছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে....

#প্রথম_খন্ডঃ

পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে। একটা পুরোনো ব্যক্তিগত এক্সপেরিয়েন্স বলি, ঘটনাটা আপনাদের আগেও বলেছিলাম,মনে আছে কিনা জানিনা....

■ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসার হিসেবে ডিউটি করছি।দিনটা খারাপ যাচ্ছিলো, একের পর এক খারাপ পেশেন্ট। ষোলকলা পূর্ণ করার জন্য ডিউটির শেষ পর্যায়ে মধ্যরাতে হার্ট অ্যাটাকের( Myocardial infarction) রোগী এসে হাজির হলো.....

ইয়াং পেশেন্ট।রোগীর ওয়াইফ একটা প্রেসক্রিপশন আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে কনফিডেন্টলি জানালো প্রেসক্রিপশনের ওষুধটি খেয়েই তার স্বামীর এই দশা....

ওষুধটার নাম দেখলাম, Vigor Ace, মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট, পেশেন্টকে জানালাম এই ওষুধ খেয়ে এই সমস্যা হবার কোনো কারণ নেই।

পেশেন্টের স্ত্রী নাছোড়বান্দা, সে কনফিডেন্ট, ব্যাগ থেকে এবার ওষুধটি বের করে আমাকে দেখালো। ওষুধটি Vigorex(Sildenafil), যৌন উত্তেজক ওষুধ, এই ওষুধের কারণে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, আসলে সেটাই হয়েছে....

ঘটনাটা কি চিন্তা করে মাথা ঝিম্ করে উঠলো। চিকিৎসক সাহেব দিয়েছিলেন Vigor Ace(মাল্টিভিটামিন), হাতের লেখা অস্পষ্ট হবার কারণে ফার্মেসীর দোকানদার দিয়েছে Vigorex( যৌন বর্ধক) ওষুধ।ডেইলী ১ টা করে Vigorex খেয়ে রোগীর এখন যায় যায় দশা....

■প্রিন্টেড প্রেসক্রিপশন এর মত আকাশ-কুসুমের চিন্তা বাদ দেই, নিজের এক্সপেরিয়েন্স থেকেই বলছি-শহর এলাকা বাদে এটি কষ্টসাধ্য।কিন্তু হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন অবশ্যই Capital হরফে হতে হবে, এটি নিয়ে এতদিন পর তোড়জোড় কেনো সেটিই প্রশ্ন.....

হাতে লেখার যে প্রেসক্রিপশন, সেটা যে বড় হাতের অক্ষরে হতে হবে সে ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। এরপরও এ ব্যাপারে যারা গাঁইগুই করেন, তাদেরকে #Davidson's Principles and Practice of Medicine এর How to write a prescription অংশের একটা লাইন কোট করে দেইঃ

"Write in block capitals, legibly, with black ball point pen....."

#দ্বিতীয়_খন্ডঃ

■আমরা চিকিৎসকেরা যে কোনো একটি ড্রাগের দু'টা নামের সাথে পরিচিত। একটি Generic name, আরেকটি Brand/ Trade name.

Generic name হলো যে কোনো ড্রাগের মূল রাসায়নিক নামের একটি পরিবর্তিত শর্ট ফরম্যাট, এ নামে যে কোনো ড্রাগকে সারা পৃথিবীর সব চিকিৎসকই চিনবেন।Trade name হলো-যে নামে একটি দেশের বিভিন্ন কোম্পানি ঐ ড্রাগকে বাজারজাত করে।

উদাহরণ দেইঃ একটি অ্যান্টিবায়োটিকের কথা বলি, জেনেরিক নেইম-Amoxicillin। আমাদের দেশে বিভিন্ন কোম্পানি একে বিভিন্ন Trade নেইমে বাজারজাত করে, যেমন- Fimoxyl, Moxacil বা Demoxil. আমরা চিকিৎসকেরা প্রেসক্রিপশনে Trade name লিখি, জেনেরিক লিখি না। আদালত এখন রুল জারি করেছে-কেনো জেনেরিক নেইম লেখা হচ্ছেনা।এত ব্যাখ্যায় যাবো না, ঘটনা বলি, সেগুলো শুনুন.....

■ঢাকার বাইরে তখন নতুন-নতুন চেম্বার করি।দুই- একটা করে পেশেন্ট পাই। এরা ফলো আপে এসে আমাকে ঝাড়ি মারে, আমার চিকিৎসায় নাকি কোনো কাজ হয়না।মন খারাপ করে বসে থাকি....

একবার এক রোগী ফলো আপে ওষুধ সহ আসলো। আমি ওষুধের বহর ও সেগুলোর Trade name দেখে ধাক্কা খেলাম। আমার প্রেসক্রাইব করা ওষুধ ও ফার্মেসীওয়ালা প্রদত্ত ওষুধে যে আকাশ-পাতাল ফারাক!

লিখেছিলাম কোয়ালিটি Maintain করে- এমন কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ওষুধ। অথচ পঙ্কজ ( ফার্মেসীওয়ালা) এমন সব কোম্পানির ওষুধ পেশেন্টকে ধরিয়ে দিয়েছে যেগুলোর নাম আমি জীবনেও শুনিনি।আমার চিকিৎসায় কাজ হবে কি! রোগী যে মারা যায় নাই-সেটাই বেশী.....

পঙ্কজকে ডেকে কড়া গলায় জানালাম যদি এ ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটে তবে আমি আর চেম্বারে আসবো না। কড়া গলায় কথা বলাতে কাজ হলো, পঙ্কজ সোজা হলো.....

■সমস্যা শুরু হলো এরপরে।নাম না জানা কোম্পানীগুলো আগে পঙ্কজকে ম্যানেজ করতো, এবার তারা আমাকে ম্যানেজ করতে উঠেপড়ে লাগলো।একটার পর একটা অনৈতিক অফার।মানুষ আমি, ফেরেশতা তো নই, লোলুপ অফার ফিরিয়ে দিতে কষ্ট হয়, এরপরও ফিরিয়ে দিলাম।

■চেম্বারে উদ্ভট উদ্ভট কোম্পানির উদ্ভট উদ্ভট রিপ্রেজেন্টেটিভ উঁকি মারতো।এরা মিষ্টি হাসি দিয়ে হাত কচলিয়ে তাদের প্রোডাক্টের গুণগাণ গায়।আমিও মিষ্টি হাসি দিয়ে তাদের খুশি রাখি, শুধু ওষুধ লেখার সময় কোয়ালিটি Maintain করি।তাদেরকে জানালাম, আমি তাদের প্রোডাক্ট লিখতে চাইলেও প্রেসক্রিপশন লেখার সময় তাদের প্রোডাক্ট এর নাম মনে থাকে না।একবার তো এক রিপ্রেজেন্টেটিভ রাগ করে এক রোগী বের হবার পর রুমে ঢুকে বললো, "স্যার রোগী ঢুকার আগে প্রোডাক্ট এর নাম বলে গেলাম, এরপরও ভুলে গেলেন!" আমি হেসে জানালাম, আমি Alzheimer এর রোগী, Recent memory এর করুণ দশা!' কয়েকদফা এরকম চলার পর ব্যর্থ মনোরথে এরা পার্মানেন্টলি প্রস্থান করলো....

ঘটনা এখানে শেষ হলে ভালো হতো, বাট পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরা দোস্ত....

আউল-ফাউল কোম্পানির যে মোটকা এক রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাকে তাদের প্রোডাক্ট লেখার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জোরাজুরি করে টর্চার করতো, সেই মোটকা বছর খানেক পর চেম্বারে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত তার মাকে নিয়ে ঢুকলো। আমার চোখ চকচক্ করে উঠলো।চার-চারটা প্রোডাক্ট লিখলাম সেই আউল-ফাউল কোম্পানির। আহ, কি শান্তি!

সমস্যা হলো- তার কোম্পানির সব প্রোডাক্ট লেখার পরও এবার ব্যাটা মুখ কালো করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো....

আমিঃ (আনন্দিত চিত্তে) কি, কোনো সমস্যা?

মোটকাঃ স্যার, সবই দেখি আমার কোম্পানির প্রোডাক্ট !

আমিঃ হে হে, আপনি তো তাই চাইতেন সবসময়....

মোটকাঃ না মানে, স্যার, তখন কত কইতাম আমার প্রোডাক্ট লেখার জন্য। সে সময় খালি বলতেন-আপনার নাকি Dementia আছে।এখন তো দেখি আপনার সবই মনে আছে.....

মোটকা বিদায় হলো। পঙ্কজের কাছে শুনলাম নিজের মায়ের জন্য ওষুধ নেবার সময় নিজের কোম্পানি বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ওষুধই নাকি সে নিয়েছে।বাটপার আর কাকে বলে!

■প্রেসক্রিপশনে ট্রেড নেইমের বদলে জেনেরিক নেইম লেখার পক্ষপাতী আমি নিজেও, তবে সেটি আরো বছর ১০ পরে। এ সময়ে দুটি সুনির্দিষ্ট কাজ করতে হবেঃ

ক) অনুমোদন দেয়া সব ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর স্ট্যান্ডার্ড একই রকম হতে হবে

খ) প্রতিটা ফার্মেসীতে ফার্মাসিস্ট নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে....

তার আগে এই ডিসিশন নেয়া হলে সাধারণ জনগণ ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে....

■একটা ঘটনা বোধ হয় আমরা ভুলে যাচ্ছি--৮০ থেকে ৯০ এর দশকের মাঝামাঝিতে কোয়ালিটি মেইনটেইন করে না -এমন কোম্পানির প্যারাসিটামল খেয়ে শ'য়ে শ'য়ে বাচ্চা মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছিলো।এক চিকিৎসকের সময়োপযোগী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অ্যাকশনে সে যাত্রায় এই জাতি রক্ষা পায়।আবারও একই পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে।বাঙালির মেমোরি গোল্ডফিশ টাইপ, এরা ইতিহাস ভুলে যায়।আফসোস.....

■যেটা সঠিক, সেটা মানতে হবে। প্রেসক্রিপশন আরো স্পষ্ট হতে হবে--কোনো দ্বিমত নেই।বাট, প্রেসক্রিপশনে জেনেরিক নেইম লেখার সময় এখনো আসেনি....

■প্রেসক্রিপশনে Trade name লেখার পরিবর্তে Generic name লেখার এই যে ধোঁয়া--এর কারণটা ঈর্ষাজনিত। বাঙালি মনে করে--ডাক্তাররা Trade name লেখে, কাজেই কোম্পানির সাথে ডাক্তারদের কিছু লুতুপুতু আছে। কিছু আছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বাঙালি এটা বিশ্লেষণ করতে পারলো না যে, জেনেরিক নেইম লেখার ট্রেন্ড চালু হলে তাদেরকে এখন নির্ভর করতে হবে অশিক্ষিত/ অর্ধশিক্ষিত ফার্মেসীওয়ালাদের উপরে। নাম না জানা অসংখ্য মানবিবর্জিত কোম্পানিগুলো এই সুযোগের অপেক্ষায়ই ছিলো। উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তের উপর এই জাতি আস্থা রাখতে পারছে না, এরা এখন তাদের জীবন-মরণ ইস্যুতে আস্থা রাখতে চাচ্ছে ফার্মেসীওয়ালা আর কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের উপর।আহাম্মক কাহিকা!.......

#পরিশেষঃ

লেখাটা শেষ করি।আমি তুচ্ছ লোক, আমার কথা নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত বোধ করি যাবেনা।রুল জারি করা যেতে পারতো- সব ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি কেনো একই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে না-সে ইস্যুতে।সেটি অবশ্য করা হয়নি, বাংলাদেশ বলে কথা, আমরা সোজা কাজ ঘুরিয়ে করতে পছন্দ করি.....

কয়দিন পর হয়তো আমরা চিকিৎসকেরা সবাই জেনেরিক নেইমে ওষুধের নাম লিখবো।আমরা পিছু হটবো, রঙ্গমঞ্চে ফার্মেসীওয়ালা আর কোম্পানির লোকেরা আসবে। আসুক, আমার কি? নিজের জিনিস যারা নিজেরা বোঝেনা -সেখানে আমার কিছু বলার নেই।তার চেয়ে সক্রেটিসের একটা কথা বলে বিদায় নেইঃ

"The hour of departure has arrived, and we go our separate ways, I to die, and you to live. Which of these two is better only God knows....."


_____________________________


ডা. জামান অ্যালেক্স দেশের জনপ্রিয়তম কথাশিল্পীদের একজন। লোকসেবী চিকিৎসক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।