|

ডা. শাম্মীর মৃত্যু এবং চিকিৎসকদের উর্ধমুখী থুথু


Published: 2016-12-18 19:56:26 BdST, Updated: 2017-04-25 10:35:44 BdST

 

ডা. আশীষ দেবনাথ
_____________________________


গত ১২ ডিসেম্বর ল্যাব-এইড হাসপাতালে করোনারী এনজিওগ্রাম করতে গিয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ নাঈমুল হক শাম্মী অকালমৃত্যুর শিকার হয়েছেন।

এই মৃত্যুকে ঘিরে উক্ত চিকিৎসায় ত্রুটি, ল্যাব-এইড হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বজন- শুভার্থীদের লেখাগুলো পড়ছিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমর্থনে কোন চিকিৎসকের খুচরো ব্যাখ্যাও দেখেছি। সবটাই কেমন যেন বেসুরো ঠেকছে।

করোনারী এনজিওগ্রাম কি?
এক কথায় এটি একটি বিশেষায়িত এক্স-রে। যার মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে ব্লক কিংবা রক্তনালীর সরু হয়ে যাওয়া কোথায়, কতটা নির্ধারন করে চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারন করা হয়।
এনজিওগ্রাম করা হয় দুটি উদ্দেশ্যে-
~রোগ নির্নয় (diagnostic)
~চিকিৎসায় (therapeutic)

ডাঃ শাম্মীর চিকিৎসায় কি ঘটেছিল?
বিভিন্ন লেখালেখি থেকে জানতে পারি এখানে দুটি ধাপই এক সিটিংএ সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রথমে তার হৃদযন্ত্রে চারটি ব্লক ধরা পড়লে তাৎক্ষনিক সম্মতি নিয়ে ব্লকের চিকিৎসা দেবার সময় দূর্ঘটনাটি ঘটে।
এখানে প্রশ্ন জাগে-
তাৎক্ষনিক ভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটি নিতে রোগী কতটা ফিট ছিল?
রিস্ক, বেনেফিট ব্যাখ্যা কিংবা চিকিৎসায় রোগীকে screening কতটা করা হয়েছিল?
তাৎক্ষনিক অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি কতটা নিয়েছিল সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকবৃন্দ?

রোগী পক্ষের সম্মতি প্রদান চিকিৎসকদের সেইফ গার্ড মাত্র। কিন্তু কোন দুর্ঘটনায় প্রস্তুতির দূর্বলতার দায় সেবাদানকারী চিকিৎসকেরই। ডাঃ শাম্মীর চিকিৎসায় এখানেই বোধকরি আসল ফাঁকটা। যার দায় পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের।

চিকিৎসায় জটিলতা যে কোন প্রসিডিউরেই থাকে। কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে এবং জটিলতায় সার্বিক চেষ্টার পরেও যদি কোন মৃত্যু ঘটে তখন মনকে প্রবোধ দেয়া যায়। কিন্তু চিকিৎসায় অবহেলা কিংবা সাপোর্টের অভাবে কোন মৃত্যু হলে তা মানা যায়না।

এখানে কি ঘটেছিল?
উপস্থিত শুভাকাংখীদের ভাষ্যমতে ডাঃ শাম্মীর অবস্থার অবনতি হলে অক্সিজেন হাতের কাছে পাওয়া যায়নি। এমন অবস্থায় টিউব দিয়ে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন মেইনটেইন করার জন্য এনেসথেসিওলজিষ্ট ডেকে আনতে গিয়ে সময় লেগে যায়। ততক্ষনে রোগীর স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়।

চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ব্যাখ্যাটি পর্যালোচনা করা যাক-
তারা বলছেন, ডাঃ শাম্মীর রক্তচাপ হঠাৎ ২২০/১২০ হয়ে যায় এবং ফলে ফুসফুসে পানি জমে (হার্ট ফেইলিউর)। ফলে শরীরে অক্সিজেন কমে গেলে শতচেষ্টায়ও তাকে বাঁচানো যায়নি।
এখানেইতো রোগীকে সঠিক screening করার প্রশ্নটি চলে আসে?
আর একটা প্রশ্ন?
এটা কি কার্ডিয়াক ফেইলিউর নাকি এরেস্ট ছিল? ইনটিউবেট করার প্রসঙ্গ যখন শুরুতেই এসেছে মানে এটা কার্ডিয়াক এরেষ্ট ছিল বলেই মনে হয়। তাই চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দেয়া ব্যাখ্যাও ধোপে টেকেনা। এর বাইরে চিকিৎসাকালে ঘটা কোন দুর্ঘটনা অবশ্যই মানবিক ভুল। যার দায় নির্দিষ্ট চিকিৎসকেরই।

ল্যাব-এইড এদেশের সর্বোচ্চ মানের প্রাইভেট চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। সেখানে হৃদযন্ত্রের চিকিৎসার মত সংবেদনশীল প্রসিডিউরের স্থানে অক্সিজেন না থাকা, ভেন্টিলেটরের অপ্রতুলতা রীতিমত অবাক করেছে।

আমাদের রোগীরা কেন বিদেশে যায় এমন অভিযোগ প্রায় সময়ই চিকিৎসকরা করে থাকেন। যারা বিদেশে যান তারা মূলত বিদেশে রোগীর সাথে মানবিক ব্যবহার এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার প্রশংসার বিষয়টিই বলে থাকেন। ডাঃ শাম্মীর মৃত্যুর দূর্ঘটনাটি আমাদের চিকিৎসা সেবার এই দূর্বল দিকটাকেই আরো উলঙ্গ করলো প্রকটভাবে।

ডাঃ শাম্মী সরকার সমর্থক দলের সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে শুভাকাংখীরা সুষ্টু তদন্তের সমর্থনে ইভেন্ট খুলছেন দেখলাম।
এর মানেটা কি?
দেশের কথিত উচ্চপর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকরা করপোরেট ব্যবস্থার কাছে জিম্মি বুঝি। সমাজের প্রেক্ষাপটে এটা যত বড় সত্যই হোক শেষ বিচারে দায়টা কিন্তু চিকিৎসকদেরই। তাই চিকিৎসা সেবার মানবিক মূল্যবোধ এবং গুনগত মান রক্ষায় কোন আপোষ পেশার স্বার্থেই কোন চিকিৎসক কখনো করতে পারেনা। নয়তো তারাও যে এহেন করপোরেট তথা পুঁজিবাদের আগ্রাসী ব্যবস্থাপনার বলী হবেন এটাতো আজ নিশ্চিত। ডাঃ শাম্মী তা সকল চিকিৎসকদের চোখে আঙ্গুল দিয়েই দেখিয়ে গেলেন।।

____________________________

 

লেখক ডা. আশীষ দেবনাথ
বিশেষজ্ঞ এনেসথেসিওলজিষ্ট, নোয়াখালী।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।