|

ডাক্তাররা সবাই বীর হেক্টর : লোভী ধনীর দুলালীকে সাফ জানালেন বাংলাদেশী শিক্ষক


Published: 2016-12-11 19:28:33 BdST, Updated: 2017-06-22 22:34:43 BdST

                           

 

 

ডা. জামান অ্যালেক্স
_____________________________

আপনারা জানেন কিনা জানিনা, তবে একটা তথ্য দেই--এই দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক 'হুলস্থূল' টাইপের বড়লোক বাস করেন।আমার সৌভাগ্য (অথবা দুর্ভাগ্য)--এই টাইপ কিছু ফ্যামিলির সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো কিংবা আছে....

আমার অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরণের ফ্যামিলির প্রধান যে ব্যক্তি, তিনি সাধারণত অলসভাবে টিভির রিমোট টিপাটিপি ছাড়া আর তেমন কোনো কাজ করেন না।মাঝে মাঝে কিছুদিনের জন্য উধাও হন, তখন বুঝে নিতে হবে তিনি দেশের বাইরে প্রমোদভ্রমণে আছেন....

●●যাই হোক, মূল কথায় আসি।এমন এক ফ্যামিলির কর্তাব্যক্তির ইচ্ছা হলো তিনি তার মেয়েকে ডাক্তারি পড়াবেন।মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় তার মেয়ে যে নাম্বার পেল তাতে আমাদের দেশের বেসরকারী মেডিকেল তো দূরের কথা, আফ্রিকার কোন প্রাইভেট মেডিকেলেও তার চান্স পাবার কথা না।আমার ধারণা ভূল প্রমাণিত হলো, 'হুলস্থূল' বড়লোক পিতার আদরের কন্যা ঢাকারই এক প্রতিষ্ঠিত বেসরকারী মেডিকেলে ক্লাস করা শুরু করলো......

 

 

এই ঘটনার ৪ বছর পর কোনো একদিন ঘটনাচক্রে মেয়েটির সাথে তার Aim in Life নিয়ে আমার কথাবার্তা হচ্ছিলো।মেয়েটি তখন ফোর্থ ইয়ারে।হুবহু মনে নেই, তারপরও আমার সাথে মেয়েটির কথাবার্তার কিছু অংশ তুলে ধরলামঃ

আমিঃতোমার ফিউচার প্ল্যান কি?

ধনীর দুলালীঃএইতো, ডাক্তার হবো, প্রচুর টাকা ইনকাম করবো..

আমিঃ তারপর?

ধনীর দুলালীঃ তারপর আর কি! ঐ টাকা দিয়ে প্রতি মাসে দেশ-বিদেশ ঘুরবো, শপিং করবো...

আমিঃ(আমি ততক্ষণে কিছুটা বিরক্ত) তোমার কি ধারণা?ডাক্তাররা কত টাকা ইনকাম করে?

ধনীর দুলালীঃ কোটি কোটি টাকা নিশ্চয়ই। একারণেই তো ডাক্তারি পড়ছি।আচ্ছা, আমাকে একটা বুদ্ধি দেনতো-আমি কোন লাইনে পড়বো?সার্জারী না মেডিসিন? কোন লাইনে টাকা বেশী?

আমিঃ(দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললাম) ডাক্তাররা কোটি কোটি টাকা ইনকাম করে, তোমার এই ধারণাটা ভূল।আমার মনে হয়-তুমি ডাক্তারি পড়া বাদ দাও। আমি জানি, ফ্যাশনের প্রতি তোমার আগ্রহ আছে, ফ্যাশন ডিজাইনার হও, কিছুটা হলেও তোমার স্বপ্ন পূরণ হবে....

ধনীর দুলালীঃ আপনি কি বলতে চাচ্ছেন-ডাক্তারী পড়ে আমার কোটি কোটি টাকা ইনকাম ও বিদেশ ঘোরা হবেনা?

আমিঃস্বপ্ন তোমার পূরণ হবে, তবে ডাক্তারী পড়ে না। তুমি তোমার স্ট্যাটাসের কোনো এক ছেলেকে বিয়ে করবে, ছেলেটি তোমার স্বপ্ন পূরণ করবে....

ধনীর দুলালীঃতারমানে আপনি যে দিনের পর দিন কষ্ট করে ডাক্তারি পড়ছেন-সেটা কি এমনি এমনি?

আমিঃ নাহ, সেটা এমনি এমনি নাহ্। শোনো, তোমাকে একটা ঘটনা বলি,দেখো কিছু বুঝতে পারো কিনা.....

 

●●প্রিয় পাঠক, যে ঘটনাটি আমি মেয়েটিকে বলেছিলাম তা আমার ও মেয়েটির মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে আপনাদের সাথেও শেয়ার করছি......

"সময়টা ২০১১।আমি তখন DMC তে কার্ডিওলজীতে অনারারী মেডিকেল অফিসার।নাইট ডিউটিতে আমি ও ডাঃমাহবুব ভাই, দু'জনে মিলে Oxford এর Cardiology অংশটুকু পড়বো বলে ঠিক করেছি যদিনা কোনো ক্রিটিক্যাল কেইস আসে....

Danger comes when danger is feared... রাত ১ টার দিকে হঠাৎ স্ট্রেচারে করে মধ্যবয়সী এক লোককে নিয়ে আসা হলো, বুকে প্রচন্ড ব্যাথা, তীব্র শ্বাসকষ্টও হচ্ছে, লোকটির সাথে তার স্ত্রী ও কিশোরী মেয়ে, দুজনেই কাঁদছে।

ইমিডিয়েট ECG করে দেখি ক্ল্যাসিক্যাল STEMI (হার্ট অ্যাটাক), ক্লিনিক্যালি হার্ট ফেইলোরও আছে।ক্রিটিক্যাল কেইস।এরকম এক রোগীই পুরো রাতকে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ঠ.....

আমি ও মাহবুব ভাই মিলে ট্রিটমেন্ট স্টার্ট করলাম।STEMI ও হার্ট ফেইলোরের এর ট্রিটমেন্ট স্টার্ট করে পেশেন্টের বেডের দুই পাশে আমরা দুই ডাক্তার দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পেশেন্ট শকে চলে গেলো( Anaphylactic shock due to Streptokinase)।অলমোস্ট 'Gone case' এই পেশেন্টকে নিয়ে আমাদের তখন দফা রফা অবস্থা....

ঝাড়া ২ ঘন্টা চেষ্টার পর পেশেন্ট স্ট্যাবল হলো, শ্বাসকষ্ট ও বুকের ব্যাথাও কমলো।টায়ার্ড হয়ে সেইদিনের পড়া ইস্তফা দিয়ে আমি ও মাহবুব ভাই রেস্ট নিতে গেলাম.....

ভোরবেলা একবার পেশেন্টের কাছে গিয়ে দেখি পেশেন্ট ঘুমাচ্ছে, বেডের দুই পাশের দুই চেয়ারে পেশেন্টের স্ত্রী ও তার মেয়েও নিদ্রাচ্ছন্ন, আমি মিনিট খানেক পালস্ দেখে আবার রেস্টরুমে ঢুকলাম...

ডাঃ মাহবুব ভাইকে আগেই বলা ছিলো যে একটা জরুরী কাজে আমি সকাল সকাল হাসপাতাল থেকে বের হবো।সকাল ৭:৩০ টায় রেস্ট রুম থেকে বের হয়ে প্রথমেই চোখ পড়লো গত রাতের পেশেন্টের বেডের দিকে।পেশেন্ট আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিতে কোন কষ্ট নেই।আমাকে দেখে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো....."

●●ঘটনাটি বলার পর আমি ধনীর দুলালীকে প্রশ্ন করলামঃ "বলতো, এই যে সারারাত আমি ও ডাঃ মাহবুব ভাই লোকটাকে বাঁচানোর জন্য কষ্ট করলাম-তা থেকে আমাদের অর্জনটা কি?"

ধনীর দুলালীঃ জানিনাতো! কত টাকা পেয়েছিলেন আপনারা?

আমি আবারও দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম, বললামঃ

'একটি টাকাও পাইনি। তবে আমাদের অর্জনটা তোমাকে বলি- ক্ষণিক সময়ের জন্য আমার ও পেশেন্টের মাঝে যে নন-ভার্বাল কম্যুনিকেশন হয়েছিলো তার ব্যাপকতা বেশ গভীর।তার চাহনিতে ছিলো নির্ভরতা, তার চাহনিতে কৃতজ্ঞতা ছিলো স্পষ্ট, তার যে চোখের পানি -তা ছিলো আমার জন্য অমূল্য সম্পদ, যে সম্পদের কোন Monetary value calculate করা তোমার পক্ষে সম্ভব না....'

আমার আর কখনো ঐ বাসাটায় যাওয়া হয়নি....

●●গত কয়েকদশক আগে চিকিৎসকদের যে জৌলুস ছিলো, এখন কিন্তু তা আর নেই।চিকিৎসকরা এখন আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিগৃহীত।গতকাল পেপারে দেখলাম-এদেশে ডাক্তারদের একটা বড় অংশ বেকার।তার উপর প্রতিনিয়ত কসাই, কমিশনখোর গালি তো আছেই।পান থেকে চুন খসলে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হবার ঘটনাও ঘটে। এরপরও এদেশে চিকিৎসকরা মাথা নিচু করে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন...

●●গ্রীক বীর হেক্টরের কথা কি জানা আছে? ট্রয় নগরীর দূর্ভেদ্য দুর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে আরেক বীর একিলিস যখন হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, 'ট্রয় নগরীতে কি একজন বীরপুরুষও নেই যে আমার সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করতে সাহস করে?' পরাজয় নিশ্চিত জেনেও ট্রয়ের মান-সম্মান রক্ষার্থে হেক্টর এগিয়ে এসেছিলো। এত প্রতিকূল পরিবেশে এই দেশে চিকিৎসকদের কাজ করতে দেখে আমার মনে হয় প্রত্যেকটা চিকিৎসক এক এক জন "বীর হেক্টর"....

●●এত লাঞ্ছনা-বঞ্চনার পরও এদেশে চিকিৎসকরা কেন চিকিৎসা দেন? টাকার কারণে? তা তো বটেই--তবে টাকার ব্যাপারটা গৌণ। ঢাকা মেডিকেলের কার্ডিওতে ট্রেনিং করার সময় যে ঘটনাটি আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম, আপনারা নিশ্চিত থাকুন-প্রতিটি চিকিৎসকের জীবনে এহেন একাধিক ঘটনা আছে।এসব ঘটনাগুলোই পরবর্তী রোগীর প্রতি মমতার হাত প্রশস্ত করতে প্রতিটি চিকিৎসকের মনে দীপ জ্বেলে যায়....

এদেশে চিকিৎসক হিসেবে যে বিপদসংকুল পথ আমাদের অতিক্রম করতে হয়-সেখানে এই আলোকীয় ঘটনাগুলো আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়।" চন্দ্র কহে, বিশ্বে আলো দিয়েছি ছড়ায়ে, কলঙ্ক যা আছে তাহা আছে মোর গায়ে"....চিকিৎসক হিসেবে সাধারণ মানুষদের যে কটূক্তি আমাদের সহ্য করতে হয়, সে আপাত কলঙ্ক না হয় গায়ে মেখে নিলাম, নীরবে আমরা আলো ছড়াচ্ছি --সেটাই বা কম কিসে?

●●DMC এর যে ঘটনাটি আমি শেয়ার করেছি সেখানে আমি কিন্তু শুধু একটি জীবন বাঁচাতে সাপোটিং রোল প্লে করিনি, আমি একটি প্রেমময়ী স্ত্রীর হাসিকে ধরে রাখতে রোল প্লে করেছি, একটি মেয়ে যাতে পিতৃহারা না হয় তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা পালন করেছি....

 

 

●●এবার নিজের কথা বলি। হয়ত এ পেশায় থেকে বছর বছর গাড়ির মডেল আমি পরিবর্তন করতে পারি না, হয়ত এ পেশা ও বিবেকের কারণে অভিজাত শ্রেণীর মত নাইটক্লাবে দশকের পর দশক পুরোনো শ্যাম্পেইনের বোতল আমি খুলি না, হয়ত একটার পর একটা ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট কেনার ক্ষমতা এই প্রোফেশন আমাকে দেয় না, হয়ত প্রতি বছর অবৈধ অর্থ দিয়ে প্রিয়তমাকে ডায়মন্ডের জুয়েলারী কিনার সামর্থ্য এই পেশা আমাকে দেয়নি, কিন্তু অমূল্য অকৃত্রিম হাসির দেখা এ পেশায় আমি পেয়েছি।এ পেশার কারণেই নিষ্পাপ ও বিশুদ্ধ আনন্দাশ্রুর মত বিরল সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে...

●●অবারিত অর্থে-বিত্তে বড় হওয়া সেই মেয়েটির কথা আমার মাঝে মাঝে মনে পড়ে।মেয়েটির জন্য আমার করুণা হয়।'জীবনের সার্থকতা' আর 'অর্থ' মেয়েটির কাছে সমার্থক।কি বিভ্রমের মাঝেই না মেয়েটি চিকিৎসক হচ্ছে!

একটি পেশেন্টকে সুস্থ করে তোলার যে প্রয়াস তাতে চিকিৎসকের যে অপার্থিব তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে-এই মেয়েটি কি কখনো তা অনুভব করবে? চিকিৎসকের সেই আত্মতৃপ্তিকে পরিমাপ করার যন্ত্র যে এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নেই--সেই তথ্যটি কি আর্দ্র হৃদয়ের কেউ এই মেয়েটিকে কোনোদিন জানাবে? মৃত্যুপথযাত্রী কোন ব্যক্তি চিকিৎসকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যখন সুস্থ হয়ে তার বাসায় ফিরে যায়-তখন তার চোখেমুখে আনন্দের যে অজস্র ঝর্ণাধারা ঝরে পড়ে -তার সন্ধান কি কোনদিন এই মেয়েটি পাবে?

____________________________

 

ডা. জামান অ্যালেক্স । নিভৃতচারী কথাশিল্পী।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।