|

মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে এক ডাক্তারের কড়া ডোজের খোলা চিঠি


Published: 2016-12-06 11:18:27 BdST, Updated: 2017-03-26 07:27:23 BdST

 

    

 

___________________________
ডা. তানজীর আহমেদ শুভ
_______________________

 

অনেকদিন লিখালিখি করি না। চিকিৎসক, সাংবাদিক আর মন্ত্রী মহোদয়দের ত্রিমুখী ত্রৈরথ নিয়ে তো আরো না। যাই হোক আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় একজন বিশেষজ্ঞ মনে করেন। তা তিনি করতেই পারেন। ঘাস খেয়ে তো আর মন্ত্রী হন নাই। উনি বিশেষজ্ঞ হোন অথবা বিশেষ অজ্ঞ হোন তাতে তো সরকারে র কিছু যায় আসে না। উনি একটি গুরুত্ব পুর্ন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী এইটাই বড় কথা। মন্ত্রী হওয়ার পরপর ই উনি প্রথম যেই কাজ টা করেন সেটা হচ্ছে ১১ (অথবা ১২ টা) প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের অনুমোদন বাতিল করেন। প্রাইভেট মেডিকেলের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও আমি এতে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলাম। কারন হেলথ সিস্টেম নিয়ে কাজ করার বদৌলতে খুব ভাল করেই জানি যে এইসব মেডিকেলে পড়ানোর মত ফ্যাকাল্টির সাপ্লাই দেশে নাই। এরপর থেকেই উনার লাইম লাইটে আসা শুরু। ডাক্তাররাও সন্ত্রাসী নামক সিনেমার পরিচালনা করলেন খুব দক্ষ ভাবে। এবং সিনেমার শেষে আদালতের বিচারক ও বনে গিয়ে রায় দিলেন এখন থেকে তিন বছর গ্রামে থাকতে হবে। ধন্যবাদ আপনাকে, দেশের মানুসের স্বাস্থ্য নিয়ে এত গভীর ভাবে চিন্তা করার জন্য। মাননীয় মন্ত্রী, আপনার নিজের কাছেই কি মনে হয় এটা বাস্তব সম্মত?

 

 

স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রত্যেকটি মানুষের অধিকার আছে তার জায়গায় থেকে গুনগত মানের সবাস্থ্যসেবা পাওয়ার। তার জন্য দরকার পর্যাপ্ত পরিমানে দক্ষ জনবল এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এবং এই জনবলের তার কর্মক্ষেত্রে থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ন। মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়, আসেন প্রথমে ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং লজিস্টিক সাপোর্টের কথায় আসি।

 


আমার মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষিকা, যিনি পরে সরকারী চাকরী তে জয়েন করেছেন, তিনি কয়েকদিন আগে একটি ইমার্জেন্সী কেস হ্যান্ডল করছিলেন কোন একটি সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। উনি যখন গ্লাভস পরতে যান, যেটাই পরেন, পুরোপুরি পরার আগেই ছিড়ে যাচ্ছিল।

 

শোনা কথায় কান দিতে নেই, তারপর ও বলছি, যে অই গ্লাভস নাকি সাপ্লাই দেন আপনার ই সরকারের কোন একজন উচ্চপদস্থ এম পি র কোম্পানী। তারপর তিনি যখন চেতনানাশক দিতে বললেন তখন সহকারী বলল যে বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে, কারন সরকারী টা কাজ করেনা!!!!!! যাই হোক এরপর ও তিনি দিনের পর দিন সেখানে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

এইবার আসি হিউম্যান রিসোর্সের কথায়। মাননীয় মন্ত্রী আপনার এবং আপনার পুর্বসুরীর মন্ত্রিত্বের সময় আপনারা হাজার চেষ্টা করে ও ডাক্তার দের গ্রামে রাখতে পারেন নাই। দুই বছর তো দুরের কথা, এক বছর ই বা কয়জন কে রাখতে পেরেছেন তা জানতে আমার বড়ই আগ্রহ।

 

আমি আমার বন্ধু এবং পরিচিত দের মধ্যে হাতে গুনে বলে দিতে পারব যে কয়জন নিয়মিত তাদের কর্মস্থলে থাকেন। আমি আমার নিজের কানে আমার এক বন্ধু কে বলতে শুনেছি, আমি দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের একজন, আমি কেন গ্রামে থাকব!!!!! আমার যে সকল বন্ধু গ্রামে থাকে তারা নিজের বিবেক থেকেই গ্রামে থাকে, আপনি তাদের চাকরী খাবেন এই ভয়ে থাকেনা। আর যারা থাকেনা তারা ও কিন্তু আপনার বা আপনার দলের ক্ষমতাবলেই থাকেন না। আপনি যেখানে একবছর ই ডাক্তার দের রাখতে পারেন না, সেখানে তিন বছরের ঘোষণা দেয়াটা কি একটু বাড়াবাড়ি বলেই মনে হয় না? আগে যেটা পারেন নাই সেটা ট্রাই করেন পরে নতুন সপ্ন দেখেন। এইক্ষেত্রে স্কাই ইজ দ্যা লিমিট ইজ নট এন এপ্রোপ্রিয়েট প্রভার্ব।

 

এইবার আসি মেডিকেল এজুকেশনের কথায়। দেশে মেডিকেল কলেজ এখন ১০০ বা তার বেশি। খুবই ভাল উদ্যোগ। কিন্তু আপনার কি জানা আছে যে দেশে কয়জন যোগ্য শিক্ষক আছেন এই ১০০ টি মেডিকেলে পড়ানোর মত। আপনারা মেডিকেল এডমিশনের পাশ মার্ক করেন ১০০ তে ৪০। তার মানে হচ্ছে কেউ শতকরা ৪০ ভাগ নাম্বার পেলেই প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি হতে পারবে।


মাননীয় মন্ত্রী, টেনেটুনে এডমিশন টেস্ট পাশ করে এরা ভবিষ্যতে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সামলাবে, এদের দিয়ে ই আপনি দেশের স্বাস্থ্য উন্নয়ন করবেন। এখনো আন্ডারগ্র্যাড মেডিকেল এজুকেশনে মুঘল আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা বিরাজ করছে। পাবলিক হেলথ এর দুই পেজ সাইজের ডেফিনিশন এর একটা শব্দ মিস করলে এখনো আমাদের স্যার রা কমিউনিটি মেডিসিনে ফেল করায় দেন, অথচ রিসার্চ মেথডোলজি শেখানোতে কোন কালেই কারো আগ্রহ নাই।

 

পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন এর অবস্থা তো আরো খারাপ। আন্ডারগ্র্যাড এ তাও ওয়েটিং লিস্ট আছে। অথচ দেশে যেখানে স্পেশালিস্ট ডাক্তারের বড় ই অভাব সেখানে কোন আসনে কেউ ভর্তি না হলে অই আসন এখনো ফাকা রাখা হয়।

ইজ নট ইট ফানি?
বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে কোর্স চালু আছে অথচ পড়ানোর শিক্ষক নাই। এমন ও কোর্স আছে, যার শিক্ষক আপনার প্রানের বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ও নাই। বাইরে থেকে এসে পড়ায় যায় কেউ একজন এবং কোর্স শেষে স্টুডেন্ট দের পকেট থেকে তাকে মোটা অঙ্কের টাকা ধরায় দিতে হয়। আবার কোর্সে ভর্তির সময় কিন্তু আপনারা বলে দেন চাকরী করেত পারবে না!!!! টাকা কি এমনে এমনেই আসে নাকি?

 

মাত্র অল্প কয়েকটা প্রবলেম এর কথা বললাম। আগে এইগুলার সমাধান করেন। সমস্যা জানতে চাইলে বইলেন। লিস্ট ধরায় দিতে পারব। সমস্যার ভিতরে না জেনে হুংকার দিলেই সমাধান হয়ে যায়না।

পুনশ্চঃ আমার বন্ধু লিস্টে যারা ডাক্তার আছেন তারা আবার মনে কইরেন না যে আমি ডাক্তার দের সবাইরে ধোয়া তুলশী পাতা জ্ঞান করি। আমার যেই বসব বন্ধু মেধাবী বইলা গ্রামে যাইতে চাওনা তারা দয়া কইরা বিসি এস দিও না আর এখন চাকরী কইরা থাকলে ছাইড়া দাও। কারন বিসিএস দেয়ার আগেই তোমরা জানো যে এই অবস্থা র মধ্যে দিয়ে তোমরা যাবা। কিছু না কইরা মাস শেষে বেতন নিয়া যাবা তা তো আর হয় না, তাইনা?


_____________________________

 

লেখক ডা. তানজীর আহমেদ শুভ । তরুণ মেধাবী লেখক । প্রবাসী । দেশে এসে লোকসেবা করেন তার ডাক্তার পিতার মত।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।