|

চেয়ারম্যানের বউকে দেখতে যান নি ডাক্তার : অত:পর যা ঘটলো


Published: 2017-03-05 19:58:47 BdST, Updated: 2017-10-22 05:19:15 BdST


লেখক ডা. মোরশেদ হাসান

 

ডা. মোরশেদ হাসান
_________________________

খবির উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের সামনের ছাপড়া চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নিস্পৃহভাবে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। এটা দ্বিতীয় কাপ চা। প্রথম কাপে দুধ চিনি ঠিকমতো হয়নি বলে চা দোকানের সামনে ছুঁড়ে মেরেছে সে। শামসু মিঞা নেই। নতুন একটা ছেলে চা বানিয়েছে। খবিরের চায়ে দুধ চিনি বাড়িয়ে দিতে হয় এটা তার জানা নেই। খবির একটা কঠিন কান থাবড়া দিতে পারত। কিন্তু সেটা জায়গা মতো দিতে হবে বলে চোখ লাল করে ছেলেটিকে দুধ চিনি বাড়িয়ে নতুন পাত্তি দিয়ে চা দেওয়ার হুকুম দেয়। বেনসন ধরিয়েছে সে। লাল্টু এসে খবর দিয়েছে জরুরি বিভাগে সেই ডাক্তার এখনও ডিউটিতে আছে।

 

রাত আটটা বাজে। সেল ফোনে উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলল খবির। চেয়ারম্যান শিকদার খুব ক্ষেপে আছেন। তাঁর স্ত্রীর পায়ের ব্যথাটা সন্ধ্যা থেকেই বেড়েছে। গতমাসেই মাদ্রাজে ডাক্তার দেখিয়ে এনেছেন। সেখানকার ডাক্তার মৈনাক পর্বতের মতো শরীর দেখে শরীফাকে দশ কেজি ওজন কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সকাল-বিকাল নিয়ম করে হাঁটতে বলেছেন। চিকিৎসার জন্য টাকা ভালোই খরচ হয়েছে। কিন্তু সেটা ব্যাপার না। ইন্ডিয়ান ডাক্তারদের কথা খুবই মিঠা। কী সুন্দর করে হিন্দিতে শরীফা ও তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। শরীফা ইন্ডিয়ান ডাক্তারদের পরামর্শ বাদ দিয়ে সকাল-বিকাল তাঁদের দেশের হিন্দি সিরিয়াল দেখেন নিয়ম করে। শরীফার পায়ের ব্যথা নিয়ে শিকদার খুবই বিরক্ত। এই মোটা শরীরে আগের মতো মজাও পান না।

উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে শিকদার ফোন করে বলেছেন ডাক্তার যেন বাসায় এসে তাঁর স্ত্রীকে দেখে যায়। ঘণ্টাখানেক পর বাসায় এসেছে শুধু একজন নার্স। ডাক্তার জরুরি বিভাগ ফেলে নাকি আসতে পারবেন না। ডাক্তারের সাহস দেখে সিকদার স্তম্ভিত হয়ে পড়েছেন। খবিরকে তিনি যথাকর্তব্য বুঝিয়ে দিলেন।

খবির চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে সাঙ্গপাঙ্গদের ইঙ্গিত দিয়ে বেনসনে টান দিতে দিতে হেলথ কমপ্লেক্সের সিঁড়িতে পা রাখে। জহিরকে অ্যাকশনের নিয়ম বলে দেওয়া আছে। জরুরি বিভাগে ডাক্তার মিহির একজন রোগীর হাতের কাটা অংশে স্টিচ দিয়ে তখন প্রেসক্রিপশন লিখছেন।
খবির জরুরি বিভাগে ঢুকেই অমায়িক হাসি দিয়ে বলে, আসসালামু আলাইকুম, ডাক্তার সাহেব কেমন আছেন?
মিহির এক নজর তাকিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বলেন, ভালো আছি। কী সমস্যা বলুন।
ডাক্তার সাহেব, উপজেলা চেয়ারম্যান আপনারে তাঁর বাসায় গিয়া তাঁর স্ত্রীকে দেখতে বলছিলেন।
মিহির শান্তভাবে বলল, দেখুন ডিউটিতে থাকা অবস্থায় জরুরি বিভাগ ফেলে কারও বাসায় যাওয়া যায় না। হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে আসার নিয়ম। তাও আমি একজন সিস্টারকে পাঠিয়েছি।
--ও আচ্ছা আচ্ছা। ডাক্তার সাহেব খুবই ব্যস্ত। খবির মাথার সামনের দিকে ফাঁকা হয়ে যাওয়া অংশে হাত বোলাতে বোলাতে জহিরের দিকে তাকায়।
জহির শান্তভাবে টেবিলে পিরিচ দিয়ে ঢাকা কাঁচের গ্লাস হাতে নিয়ে অর্ধেক পানি খেয়ে বাকি অর্ধেক আচমকা ডা. মিহিরের মুখে ছুঁড়ে মারে। হালার পুত তোর বাপে কইছে যাইতে তুই গেলি না ক্যান? তুই আমাগোরে চিনস? মাদারচোদ, তুই আমগো নেতারে চিনস?
জহিরের ডান হাতটা নিমিষের মধ্যে ডা. মিহিরের গালে কয়েকবার ওঠানামা করে। মিহিরের ঠোঁট কেটে মুখের ভেতর থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসে।


ডা. মিহির হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকেন।
জহির টেবিলের ওপরে থাকা রিফ্লেক্স হ্যামার নিয়ে মিহিরের মাথা বরাবর নামিয়ে আনতে যায়। এমন সময় খবির এসে তার হাত ধরে ফেলে। আরে করস কী, করস কী। ডাক্তার সাহেব সম্মানিত মানুষ। সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়। না, তোদেরকে এখনও বুঝাতেই পারলাম না কার কী সম্মান। ডাক্তার সাহেব কিছু মনে কইরেন না। পোলাপান মানুষ জানে না কিছু। মানী লোকের সঙ্গে ক্যামনে কথা কইতে হয় – কিচ্ছু জানে না। ছি ছি, ওই বেয়াদ্দপ পোলাপাইন করছস কী তোরা। সব বাইর হ। বাইর হ কইতাছি।
ডাক্তার সাহেব কিছু মনে কইরেন না।


জহিরের মনে হয় হাতের সুখ মেটে নাই। হাতের সুখ মেটার কথাও না। এই ডাক্তারগুলা অনেকটা ভ্যাবদা মাছের লাহান। বাধাও দ্যায় না। বাধা না দিলে পিটাইয়া সুখ আছে নাকি আবার।

জহিরকে জোর করেই বের করতে হল। বের হওয়ার সময় কাঁচের গ্লাস ভেঙে দিয়ে গেল সে। ঝন ঝনাৎ শব্দে হেলথ কমপ্লেক্সের লোকজন সব তটস্থ হয়ে তাকিয়ে রইল।
খবির চাঁদের আলোয় উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে সেল ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত। প্ল্যান মতো কাজ হওয়ায় সে মাথার চাঁদির ফাঁকা অংশে মনের সুখে হাত বোলায়।
জহির কিছুক্ষণ পরপরই বলছে, শালা, কসাই পিটাইছি আইজ একটা। একজন সিগারেটের তামাক ফেলে সেখানে গাঁজা ভরায় ব্যস্ত।

পরদিন পত্রিকায় ছোট করে এল দুর্বৃত্তদের হামলায় উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের ডাক্তার আহত। জেলা সদর থেকে দুঃখ প্রকাশ করে বিজ্ঞপ্তি এল – একদিন জেলার সব ডাক্তাররা কর্মবিরতি পালন করবেন; তবে রোগীদের সুবিধার্থে জরুরি বিভাগ খোলা থাকবে।
ডা. মিহিরের স্ত্রী মিলিও ডাক্তার। মিলি অন্য একটি উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে চাকরি করেন। মিলি এসেছেন আহত স্বামীকে দেখাশোনা করতে।

মিলি কাঁদতে কাঁদতে বলছে, আমরা আর এখানে থাকব না। চলো এবার একটা চেষ্টা করে বেরিয়ে যাই।

__________________________

লেখক ডা. মোরশেদ হাসান ।
Works at Medical College, Assistant Professor.
Past: Works at Ministry of Health, Maldives and ICDDR,B

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।