|

ডা. প্রাণ গোপালের বক্তব্য চিকিৎসকদের অপমান


Published: 2016-11-16 19:04:05 BdST, Updated: 2017-01-20 05:27:16 BdST

 

    

ডা. বাহারুল আলম
______________________


অধ্যাপক ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্তের ‘৪০% চিকিৎসা ব্যয়’ সম্পর্কীয় বক্তব্য বিভ্রান্তিমূলক। এই বক্তব্যে খুশী হয়েছে রাষ্ট্র ও তার কর্ণধারেরা, খুশী হয়েছে জনগণ- অপমানিত হয়েছে চিকিৎসকরা।

আমাদের সকল আলাপ/আলোচনা/বক্তব্য দেশের বিত্তবানদের নিয়ে , প্রান্তিক স্তরের বিপুল সংখ্যক নাগরিকদের চিকিৎসা ব্যয় সক্ষমতা সম্পর্কে নয় ।

অংকের হিসাব না মিলিয়ে, আবেগে বিভ্রান্ত হয়ে এ উক্তি করা হয়েছে।

রোগীর দেয় টাকার ৪০% রেফারেল ফী হিসাবে চিকিৎসককে প্রদান করার যে হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে সেটি মূলত ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পক্ষ থেকে অধিক বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জনের মানসে প্রবর্তিত প্রথা। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাণিজ্যিক ব্যক্তিরা , বাণিজ্য প্রসারে স্বাধীন।

অনেক চিকিৎসক এই ফী (৪০%)গ্রহণ করে না বিপরীতে অনেক প্রতিষ্ঠান এই ফী দেওয়ার প্রথা রাখে নি। যে সকল চিকিৎসক ‘রেফারেল ফী’ গ্রহণ করে না, তাদের রোগীদের কাছ থেকে ঐ সকল প্রতিষ্ঠান ৪০ শতাংশ চার্জ কম নেওয়ার কোন ইতিহাস নাই।তাহলে চিকিৎসক ৪০ শতাংশ অর্থ না গ্রহণ করলে কোন হিসাবে রোগীর ব্যয় কমে যেত- এ হিসাব বোধগম্য নয়।

 

             

ডাঃ প্রাণ গোপালের কথায় কতটা সত্য প্রকাশিত হল, তার চেয়েও চিকিৎসক সমাজের প্রতি নাগরিকদের বিদ্যমান বিরূপ ধারনা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

বিষয়টি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান সমূহের বাণিজ্য প্রসারের সিদ্ধান্ত। চিকিৎসকদের এর সাথে জড়ানো একতরফা ও বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য । ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান ও ক্লিনিকসমূহ সম্মিলিতভাবে এই ৪০% রেফারেল ফী চিকিৎসকে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সকল ফী বা চার্জে ৪০% কমিয়ে দিলেই চিকিৎসার এ স্তরে (রোগ নির্ণয়ের) রোগীর ব্যয় কমবে, অন্যথায় নয়। জনস্বার্থে বা রোগীর স্বার্থে এ কথাগুলো বক্তব্যে আসা প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়াও চিকিৎসার অপরাপর স্তরের ব্যয়সমূহ চিকিৎসা ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত , কেবল এক স্তরে ৪০% ব্যয় কমলেই সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় ৪০% কমে যাবে - এ হিসাবও সঠিক নয়। এটি বিভ্রান্ত মূলক ও অহেতুক চিকিৎসকদের হেয় প্রতিপন্ন করার মানসে যুতসই বিষয়।

রাষ্ট্র তার জনগণকে চিকিৎসা দিবে -- এটিই সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ ও স্বীকৃত । সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় সম্পর্কেও তার বলা উচিৎ ছিল। রাষ্ট্র যদি রোগীকে অতীতের ন্যায় বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্তে ফিরে যায় তাহলে চিকিৎসা ব্যয় কেবল ৪০% কমে নয়, শূন্যে নেমে আসত। উদাহরণ স্বরূপ- সরকারি হাসপাতালেই ‘এমআরআই’ করানোর ব্যয় ৩০০০ টাকা । এই ৩০০০ টাকা যে নাগরিকের দেওয়ার সামর্থ্য নাই , সে এমআরআই ইনভেস্টিগেশন থেকে বঞ্চিত থাকবে অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাছ থেকে নাগরিক হিসাবে সে এই সুবিধা পাবে না । এ অমানবিক সিদ্ধান্তের সাথে রাষ্ট্র নিজে জড়িত । চিকিৎসা ব্যয় কমানোর বিষয়ে রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করা উচিৎ ছিল কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে রাষ্ট্র ।

বাংলাদেশের নাগরিকদের কত শতাংশ প্রাইভেট চেম্বারে ‘রেফারেল ফি’-র আওতায় আসে আর কত শতাংশ রোগী রাষ্ট্রায়ত্ত হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রের ফী বা চার্জের আওতায় আসে এ হিসাবটিও করা প্রয়োজন ছিল।

নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক স্তরের সকল মানুষ রাষ্ট্রায়ত্ত হাসপাতাল থেকেই চিকিৎসা গ্রহণ করে। এদের চিকিৎসা ব্যয় সম্পর্কে মত প্রকাশ করা অনেক যৌক্তিক ছিল। কেবল বিত্তবানরাই প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসকের মতামত গ্রহণ করে এবং তাদের এক অংশ দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে। অর্থের অপচয় এ ক্ষেত্রেই ব্যাপক হারে ঘটে। আমাদের সকল আলোচনা বিত্তবান রোগীদের নিয়ে, প্রান্তিক স্তরের জনগণের চিকিৎসা পাওয়া/না পাওয়া ও তাদের চিকিৎসা ব্যয়ের সক্ষমতা নিয়ে তেমন কোন কথা আমরা বলি না।

ঢালাও ভাবে সকল চিকিৎসকের উদ্দেশ্যে তার মত বিজ্ঞ ও সম্মানিত চিকিৎসকের এ ধরণের উক্তি সঠিক হয় নি। যে ঘটনার সাথে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সম্পূর্ণভাবে জড়িত তা চিকিৎসকদের নামে প্রকাশ করা সমীচীন নয়।

অধ্যাপক ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্ত রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নীতি নির্ধারক/কর্ণধারদের আস্থাভাজন লোক। রাষ্ট্রকে রোগীর স্বার্থে চিকিৎসা ব্যয় সাশ্রয়ী করার প্রয়োজনে নীতি নির্ধারকদের সাথে যুদ্ধ করলে সেটি হত জন-দরদী ও জনস্বার্থে বড় যুদ্ধ। জয়ী হলে দেশের জনগণ তাকে ভালবাসা ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে চিরদিন ।

রাষ্ট্রের আনুকূল্যে থাকা আর জনস্বার্থে রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ করা এক নয়। তার এ বক্তব্যে জনস্বার্থ সংরক্ষিত হওয়ার চেয়েও রাষ্ট্রের আনুকূল্য পাওয়ার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বিভ্রান্তমূলক বক্তব্যে খুশী হয়েছে রাষ্ট্র ও তার কর্ণধারেরা, খুশী হয়েছে জনগণ- অপমানিত হয়েছে চিকিৎসকরা।


_________________________

 

লেখক ডা. বাহারুল আলম
সুলেখক। প্রখ্যাত চিকিৎসক নেতা। সুবক্তা ।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।