|

" ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে ও লিখতে খুব ভয় লাগছে "


Published: 2017-01-03 11:16:14 BdST, Updated: 2017-03-25 15:42:41 BdST


ডাক্তার প্রতিদিন
______________________

ডাক্তার প্রতিদিন -- এর বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর।
ডাক্তার প্রতিদিন কি একতরফাভাবে ডাক্তারদের মত তুলে ধরবে। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কাউকে কি বলতে দেবে না !
এই অভিযোগ ডাক্তারপেশাজীবী নন এমন পাঠক লেখকদের। তারা জানাচ্ছেন, ডাক্তারদের বিরুদ্ধে লিখতে খুব ভয় পাচ্ছেন।

আমাদের কর্তৃপক্ষীয় ব্যখ্যা হল, আমরা সবার মতামত প্রকাশ করার পক্ষে । সবার মত প্রকাশও করব। এ ক্ষেত্রে কোন ছাড় নয়। কথা সবাইকেই বলতে হবে।
ডাক্তারদের মত প্রকাশ হবেই। অন্যপক্ষে ডাক্তারদের সেবা নিয়ে নানা অভিযোগও নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে।
এখানে আনোয়ার হোসেন জুয়েলের মত এখন অামরা প্রকাশ করছি। তিনি সম্প্রতি ডা. আইনুল হকের লেখা --ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মোক্ষম জবাব-- এর প্রতিজবাব লিখেছেন।
ডা. আইনুলের লেখা ডাক্তার প্রতিদিনে প্রকাশের পর পর অনলাইনে ভাইরাল হয়। ২০০০ এর বেশী শেয়ার হয়েছে মাত্র একদিনে। পড়েছেন লাখো পাঠক। অনলাইন মিডিয়া ক্রমশ মূলধারার মিডিয়া হিসেবে জায়গা নিচ্ছে , বলাই বাহুল্য। আমরা সবাইকে অনলাইন হোক, ফেসবুক বা অন্য যে কোন মাধ্যমে নিয়মিত লেখার তাগিদ দেই।
লেখালেখির মাধ্যমেই পরস্পরের দূরত্ব দূর হবে।


আনোয়ার হোসেন জুয়েলের জবাবি লেখা হল _______________
মোক্ষম জবাবে সফলতার গল্প খুব সুন্দর হয়েছে। গল্প যদি সুন্দর না বলি তবে আক্রমনে পড়তে হতে পারে এটিও সত্য। নিজেরা নিজেরা শ্রদ্ধা বিনিময় করে ভাল থাকাতেই আসল আনন্দ! অন্য কেউ কিছু বললে সেটি বুঝে না বুঝে হোক আক্রমন করতে হবে। যাই হোক গল্পের প্রত্যেকটি সাফল্যের ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করা যেতে পারে।

 

আসেন, ২ নম্বর সাফল্য-গল্প পয়েন্টের দিকে একটু আলোকপাত করা যাক। এটি বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি সংক্রান্ত। মোক্ষম জবাবদাতা সাফল্য গল্পে কিছু প্রশ্ন রেখেছেন "এতে অবদান কাদের?" এই কথাটি বলে।
আসেন আসলেই দেখি অবদান কাদের-
- মোক্ষম জবাবদাতা ঠিক, প্রথমেই আসে হেলথ কেয়ার। এখন হেলথ কেয়ারের মধ্যে আছে মেডিসিন, ফ্যাসিলিটি, রিসার্চ, এ্যাক্সেসিবিলিটি,টেকনোলজি, নলেজেবল ম্যান পাওয়ার। এর কোনটিতে একক ভাবে কেবল চিকিৎসকরাই রয়েছে?

- আগের চেয়ে উন্নততর জীবনযাপন পদ্ধতি এই আয়ু বাড়ার আর একটি কারণ। উন্নয়নশীল দেশের মানুষ ১৯৭১ সালের চেয়ে বেশি হেলথ রিস্ক নিয়ে সচেতন, পুষ্টির ব্যাপারে কিছুটা জ্ঞান বেড়েছে, টেকনোলজি ইউজ করছে বেশি, অম্প্রুভড ডায়েট নিচ্ছে, ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। এতো গুলো সূচকে আপনাদের একক অবদান নিশ্চয় নেই?

- খাদ্য নিরাপত্তা এবং সহজ লোভ্যতা একটি বড় কারণ আয়ু বৃদ্ধির। দেশের সার্বিক খাদ্য ব্যাবস্থাপনায় আপনাদের অবদান কতটুকু দেখুন একবার।

-- প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মৃত্যু কমিয়ে ফেলা গেছে অনেকাংশে যেটি সার্বিক গড় আয়ু বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। এখানে অবদান কাদের দেখুন।

- স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বাসস্থানের উন্নতি, জীবন মানে ধনাত্নক পরিবর্তন এসেছে ১৯৭১ এর চেয়েও। এগুলোতে আপনাদের অবদান কতটুকু তা বুঝছি না।

-- কাজের পরিবেশ উন্নয়ন এবং স্ট্রেস কমেছে অনেক সরল, যৌগিক এবং আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে। যে গুলো মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়েছে। এগুলোতে আপনাদের অবদান দেখুন ভেবে।

-- বৃদ্ধ বয়সে অর্থনৈতিক যোগান (বয়স্ক ভাতা,পেনশন) বাড়ছে দিন দিন। এগুলো বৃদ্ধ বয়সে একটি নরাপত্তা কবজ হিসেবে কাজ করছে যেটি ১৯৭১ সালের পরে ছিল না। এটির ফলেও আয়ু বাড়ছে কারণ কিছু অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় সার্ভিস কিনতে পারছেন সিনয়র সিটিজেনরা। এখানে আপনাদের অবদান বিবেচনায় নিন।

-- সর্বোপরি নিরাপত্তা মান বেড়েছে। স্পোর্টস, যাতায়াত, বাসস্থান এগুলোর ইম্প্যাক্ট আছে আয়ু বৃদ্ধিতে।

-- শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার কমে এসেছে প্রধানত পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে। এটি WHO ই বলছে। এটিতে কেউ একক অবদানের দাবীদার নয় হয়তো।

-- সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কিছু কন্সিকোয়েন্সও আছে আয়ু বৃদ্ধির কারণ হিসেবে। যেমন ধরেণ কালচারাল ডাইভারসিটি, তরুণ এবং বৃদ্ধদের নেটোয়ার্কিং, বয়স্ক অভিজ্ঞ জনশক্তির সমাদর, স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রের বরাদ্দ। এগুলোর একক অবদান কখনই আপনাদের নয়।

যাই হোক আপনার প্রত্যেকটি সাফল্যের গল্পের মৌলিক দিক নিয়ে এভাবে আলোচনা করা যাবে। একদা সাফল্য লেখা বিল বোর্ডে ঢাকা শহর ভরে গিয়েছিল, মানুষ পড়ে খুব তৃপ্ত হয়েছিল। কিন্তু মানুষ চিন্তাও করে দেখেনি প্রত্যেকটি সাফল্যেই দেশের প্রতিটি মানুষের অবদান রয়েছে। ইনফ্যাক্ট পৃথিবীর সকলেরই অবদান রয়েছে। মোক্ষম জবাবের গল্পটি বেশ সুন্দর হয়েছে। কিন্তু টোটাল কোয়ালিটি বলা যাচ্ছে না।

_____________________

এবার ডা. আইনুল হকের লেখার প্রাসঙ্গিক অংশ পূন: প্রকাশ করা হল। তিনি প্রবাসী লেখক আহমেদ স্বাতীর লেখার জবাবে লিখেছিলেন ডাক্তার প্রতিদিনে।
____________


যে দেশের আলু পটল না হলে কারও বাজার সম্পুর্ন হয় না, যাদের টিভি পোগ্রাম না দেখলে মা-খালাদের পেটের ভাত হজম হয় না, যে দেশের সিনেমা না দেখলে পাবলিকের রাতের ঘুম ভাল হয় না, যাদের শাড়ি-কসমেটিকস না হলে আমাদের রমণীদের একটা দিনও চলে না, যাদের গরু না আসলে বাঙ্গালদের মাংসের চাহিদা মেটে না- তবে কেন চিকিৎসার বেলায়ই ডাক্তারদের গুষ্টি উদ্ধার হয় আমার মাথায় আসে না।

 

এবার আসেন এদেশের চিকিৎসকদের সফলতার কিছু গল্প শোনাই:

১) WHO বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানের উপর Ranking প্রকাশ করেছে যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮ তম আর ভারতের অবস্থান ১১২ তম। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র শ্রীলঙ্কার অবস্থান বাংলাদেশর উপরে (৭৬ তম)। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নের সেই মহান কারিগর কারা?

 

২) ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩৯ বছর আর ভারতের ছিল ৫০ বছর। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাড়িয়েছে ৭৪ এর কাছাকাছি। ভারতের গড় আয়ু বাড়লেও তারা আমাদের কাছাকাছি আসতে পারেনি। এতে অবদান কাদের?

 

৩) ২০০০ সালে জাতিসংঘ "সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা" ঘোষণার মাধ্যমে ৮টি লক্ষ্য নির্ধারণ করে, যার মধ্য ৩ টি ছিল স্বাস্থ্য সম্পর্কিত। এই তিনটি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এতটাই সফলকাম হয় যে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে MDG বাস্তবায়নের "রোল মডেল" হিসেবে ঘোষণা করে। এতে অবদান বেশী ছিল কাদের?

 

৪) সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য প্রায় ৭৬%, যা কিনা উন্নত দেশগুলোর প্রায় কাছাকাছি ( কানাডা ৮০%, ডেনমার্ক ৮৯%)। এই সফলতা কাদের শ্রমের ফসল বন্ধু?

 

৫) ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে পাচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪৬ জন, যা ২০১৩ সালে ৪৬-এ নেমে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই তা পূরণ হয়েছে কারণ ২০১৫ তে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৮ ।

৬) ১৯৯০ সালে মাতৃ মৃত্যুর হার ছিল ৫৭৪, যা ২০১৩ তে নেমে এসেছে ১৭০ এ। এটা কিভাবে সম্ভব হল?

বাপ দাদাদের মুখে শুনেছি তারা নাকি কার্তিক মাস কে খুব ভয় পেতেন। কার্তিক মাস পেরুলেই তারা হাফ ছেড়ে বাচতেন। কারণ ঐ সময় অসংখ্য লোক ডায়েরিয়ায় মারা যেত। আজ যারা দেশের বড় বড় পদ দখল করে আছেন অথবা দেশ জাতির চিন্তায় যাদের কি বোর্ডের বারোটা বাজছে, ICDDRB যদি ওরাল সেলাইন না আবিষ্কার করত তাহলে বাপ দাদার কল্যাণে অনেকেরই হয়ত সোসাল মিডিয়ায় জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস লেখার সৌভাগ্য হত না।

 

বাঙ্গালীদের কার্যকলাপে হতাশ হয়েই হয়ত কবিগুরু লিখে গেছেন:

"সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙ্গালী করে মানুষ কর নি।"

বিদ্রোহী কবির মেজাজ তো আরও চড়া:

"বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।"

আমার মতে, শুধু ফি নির্ধারণ করার মাধ্যমে ডাক্তারদের বস্তাবন্দী করে সুফল আসবে না। বরং সব সেক্টরকে (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ইত্যাদি) সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় নিয়ে এসে বেসরকারিকরণের মাধ্যমে সরকারী খাতগুলোকেও বেসরকারির পাশাপাশি নিয়ে যেতে হবে। জনগণ যেন তাদের সাধ্যমত যে কোন সেক্টর (সরকারি/বেসরকারি) থেকে সর্বোচ্চ সেবা পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রের, ডাক্তারদের নয়।

 

অনেক চিকিৎসকের আচরণই অমানবিক। আমি নিজেও এর ভূক্তভোগী। যার পারিবারিক শিক্ষা কোন কাজে আসেনি বা শিক্ষিত হয়েও যিনি নিজের চরিত্রের পরিবর্তন করতে পারেননি তার আচরণ সংশোধন করার দায়িত্বও আপনারই।


কিন্তু কিভাবে? আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নিশ্চয়ই নয়। আরও একটা কথা, চিকিৎসকরা ভিনগ্রহের কেউ নয়। বাঙ্গালীর কমন দোষ ত্রুটি গুলো তাদের মধ্যে কমনলি থাকাটাই স্বাভাবিক। সর্বক্ষেত্রে দেশ প্রেমের চর্চা করা সবার জন্যই কর্তব্য। এজন্যই কবি আব্দুল হাকিম বলেছেন:

"যে সব বংগেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী,
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।"

সুতরাং, ডাক্তার মারবেন না। এদেরই কেউ আপনার ভাই, কেউ বন্ধু, কেউবা প্রিয়জন। বিপদের সময় এদেরকেই পাবেন সবার আগে।

যাইহোক, আমি আশাবাদী মানুষ। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আশার আলো খুজেঁ বেড়ানোই আমার কাজ।

"আধারের ভ্রুকুটিতে ভয় নাই,
মাগো, তোমার চরণে জানি পাব ঠাঁই,
যদি এ পথ চলিতে কাটা বেধেঁ পায়
হাসিমুখে সে বেদনা সবো।"

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।