|

প্রতিষ্ঠিত পাত্র বনাম সংগ্রামী পাত্র


Published: 2016-12-27 10:21:27 BdST, Updated: 2017-01-19 08:12:36 BdST

 


হাবিবাহ নাসরিন, জনপ্রিয় লেখক
_______________________

আমার বিয়ের শাড়িটির দাম চার হাজার আট'শ টাকা। যেখানে আমারই বোন কিংবা কাজিনদের বিয়ের শাড়ির দাম পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত। আর্থিক সংকটের কারণে যে আমি কম দাম দিয়ে বিয়ের শাড়ি কিনেছি, এমন নয়। আসলে আমার মনে হয়েছে, কী দরকার, একদিনের জন্য এত বেশি টাকা নষ্ট করে! হাতে টাকা পেলে আমি পোশাক কেনার চেয়ে বই কেনায় বেশি মনোযোগ দেই। সে যাক, যার যার রুচির ব্যাপার। তবে এটা বলতে পারি, এক লক্ষ টাকার শাড়ি গায়ে জড়ানো বোনটির চেয়ে আমি মোটেও খারাপ নেই। ভালো থাকা যার যার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি মনে করেন, আপনি ভালো আছেন, তাহলেই আপনি ভালো থাকবেন।

আমার পরিচিত এক ছেলে বিয়ে করেছে। বিয়ের ছবির অ্যালবাম দেখলে আপনার মনে হবে, এ যেন বর-কনে নয়, রূপকথার রাজকুমার আর রাজপুত্রবধু, এমনই স্বপ্নীল করে ছবিগুলো তোলা হয়েছে। অথচ, বিয়ের তিন মাস যেতে না যেতেই বরটি তার বউকে এমন মার মেরেছে যে বউয়ের মাথাই ফেটে গেছে! তখন মনে হলো, সুন্দর ছবি দেখেই মুগ্ধ হওয়া ঠিক নয়। জীবন সব সময় ছবির মতো নয়। অথবা কখনো কখনো ছবির থেকেও সুন্দর।

আমার এক পরিচিত মেয়ে আছে, যার বাবা মা তার পছন্দের ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে দেয়নি, কারণ তারা চাচ্ছিল যে, তাদের মেয়েটি পড়াশুনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হোক, তারপরে বিয়ে। প্রেমিক ছেলেটির পরিবার থেকে তাড়া ছিল, সে অন্যত্র বিয়ে করে ফেলেছে। এদিকে মেয়েটি কষ্ট যা পাওয়ার তা তো পেয়েছেই, বয়সও বেড়ে যাচ্ছে অথচ মানানসই প্রস্তাব পাচ্ছে না বলে বিয়ে হচ্ছে না। পড়াশুনা শেষ, চাকরি বাকরিও পাচ্ছে না। এখন মেয়েটির মা-বাবাই কথা শোনাচ্ছে, আর কতকাল মাথার ওপর বসে বসে খাবি! মা-বাবাও যে অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের জীবন নষ্ট করে, এটি তারই উদাহরণ।

আমার যখন বিয়ে হয়, আমরা দুজনই স্টুডেন্ট। আমার একুশ, আতিকের তেইশ। আতিক কম বেতনের একটা চাকরি করে, আমার তেমন কোনো আয়-ইনকাম নেই। তবু আমার পরিবার বিয়েতে অমত করেনি। বিয়ের পরে আমরা একরূম সাবলেট নিয়ে উঠেছি। সস্তার আসবাবপত্রের দোকান থেকে কেনা দুই হাজার টাকার একটি খাট, একটি আলনা আর কম্পিউটার ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমাদের ঘরে। দীর্ঘদিন আমরা দুইজন কোনো দামী ফোন ব্যবহার করিনি। মনে আছে, দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর আমি কোনো নতুন জামা, জুতো, ব্যাগ কিনিনি। আগের যা ছিল, তাই দিয়েই চালিয়ে নিয়েছি। এক কেজি গরুর মাংস চার ভাগ করে রান্না করেছি। দিনের পর দিন শুধু সবজি দিয়েই ভাত খেয়েছি। এত যে কষ্ট করেছি, তবু একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন কখনো অভিযোগ করিনি। আমাদের পরিবারকেও কখনো বলতে যাইনি, যে আমরা কষ্ট করছি। তারা জানতো, আমরা ভালো আছি। সত্যিই আমরা ভালো আছি। প্রয়োজন ছিল কিছুটা সময় ধৈর্য্য ধরার। আমরা তা করেছি, তাই দেখতে দেখতে দৃশ্য বদলে গেল, যে জীবন আমরা শুরু করেছিলাম, তার সঙ্গে বর্তমান জীবনের কোনো মিলই নেই! ভাগ্য বদলের জন্য তো প্রচেষ্টা থাকতে হবে, তাই না?

আরেকজনের সাজানো-গোছানো জীবনে প্রবেশ করার চেয়ে দুজন মিলে সাজিয়ে নিলে, সেই জীবনটা আরো বেশি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। প্রায় সব মা-বাবাই বিয়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত পাত্র খোঁজে, মেয়ের পড়াশুনা শেষ না হলে বিয়ে দিতে চায় না। ভালো কথা, পরে যখন মেয়েটির বিয়ে হয় না তখন কেন মেয়েটিকেই দোষারোপ করে! বিয়ে মানেই তো জমকালো সাজ-পোশাক, প্রচুর মেকআপ আর রাজকুমার-রাজকুমারীর বেশে ফটোশুট নয়। এগুলো কখনোই কাউকে ভালো রাখতে সাহায্য করে না। আমাদের জীবনটা আরাম-আয়েশ করে কাটানোর জন্য নয়। এখানে সংগ্রামের মানসিকতা না থাকলে কোনো ক্ষেত্রে সফল হওয়া যায় না। টাকার পেছনে দৌড়ে যারা একটা জীবন কাটিয়ে দেয়, তারা কখনো জীবনকে অনুভব করতে পারে না।

বিয়ের সময় পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকা নষ্ট করে মেকআপ দেয়া ভূত না সেজে সেই টাকায় রাস্তায় থাকা মানুষগুলোকে একবেলা ভালো কিছু খাওয়ান। তাতে যদি আপনার মনে হয়, এতগুলো টাকা নষ্ট হলো, হোক। টাকা তো নষ্ট হতোই। আপনার মেকআপ করা মুখ দেখে আপনি ছাড়া কেউ হয়তো সুখী হতো না, কিন্তু এতগুলো মানুষ যখন একবেলা পেটপুরে খেয়ে সুখের হাসি হাসবে, সেই সুখ আপনি কোনো টাকায়ই কিনতে পারবেন না! আপনিই ঠিক করুন, কীসে আপনি তৃপ্ত, সবাইকে নিয়ে, নাকি একা একাই।

____________________________

লেখক হাবিবাহ নাসরিন । সুলেখক। সমাজ সচেতক; মানব মনের নানা অন্ধিসন্ধি নিয়ে বিভিন্ন দৈনিকে নিয়মিত লেখেন।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।