Ameen Qudir

Published:
2019-01-11 12:08:52 BdST

UBERউবার কাহিনী : বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা


 

ফাইল ছবি

কবি কামরুল হাসান
__________________________

ইদানিং শীতের কারণে ঘুম থেকে উঠতে পারি না আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস মিস করি। তখন উবারের শরণাপন্ন হই। না, গাড়িতে নয়, যাই মোটরবাইকে। ভাড়া কম, জ্যামে জমে থাকা গাড়িবহরের ফাঁক-ফোকর দিয়ে মোটরবাইক খুব স্বচ্ছন্দে চলে যায়। উবারের শরণাপন্ন হবার আরেক কারণ উবার আমাকে ডিসকাউন্ট দিয়েছে।

একদিন মিরপুর থেকে আফতাবনগর যাবো, উবার মটো ডেকেছি। প্রথম যিনি কল রিসিভ করলেন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি কোথায় যাবো। আফতাবনগর শুনে তিনি বেঁকে বসেন, যাবেন না। দ্বিতীয়জন কল ধরেছেন লালমাটিয়া থেকে। আমি অবাক হলাম, কাছের বার্তা অত দূরে গেল কী প্রকারে? তৃতীয়জন এলেন, কিন্তু তাকে পথ চেনাতে গলদঘর্ম হতে হলো, সে সোজা পথও কঠিন করে চিনছে।

আরেকদিন আমার কাছেই একজন দাঁড়িয়ে, কিন্তু উবার সফটওয়্যার তাকে না দেখিয়ে দূরের সব চালককে দেখাচ্ছিল। এরকম এক চালকের দুরত্ব বেশি বলে আমি ট্রিপ ক্যান্সেল করে দিতে বলি। সে তা করে না, ফলে আমাকে যাত্রা বাতিল করতে হয়, দণ্ড হয় ৩০ টাকা। দেরি হচ্ছে দেখে আমি তখন সেই ঘাটের তরীতে চাপি। সে যেহেতু কল পায়নি, তাই সে ডিসকাউন্টে যাবে না। ফলে ডিসকাউন্টের ৪০ টাকাও পেলাম না। যা হোক আমি যখন মিরপুর- আফতাবনগর পথের মাঝামাঝি তখন একজনের কল এলো। তার জিজ্ঞাসা আমি কোথায়?

প্রতিদিনই বাস মিস করি আর প্রতিদিনই উবার মটোতে চড়ি। প্রতিদিনই কচুক্ষেত বাজারে দীর্ঘ জ্যামে পড়ি। অত যে ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরুয় মোটরবাইক, তারও আধাঘন্টা লেগে যায় মানবসৃষ্ট
জ্যাম পেরুতে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রবেশপথে প্রতিটি গাড়িকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে আর অবশেষে ছেড়ে দিবে। গাড়ি আসে পাঁচসারি হয়ে, গেট দিয়ে প্রবেশ করে একসারি, জ্যাম তো হবেই। উবার চালক আমাকে জানালো জ্যামের রহস্য। সেনানিবাসের ভেতর গাড়ি চলাচল স্বচ্ছন্দ রাখতেই নাকি ঐ নিয়ন্ত্রণ।

তাকে বেশ চিন্তাশীল মনে হলো। জ্যামে যখন আটকে আছি সে তখন আমাকে সেনাবাহিনী নিয়ে তার বিশদ পরিকল্পনার কথা জানায়। তার দুটি পরিকল্পনা আমার মনে ধরে। প্রথমটি হলো সেনাবাহিনী এই যে প্রতিদিন লেফট-রাইট আর পিটি করে, করাটা দরকার, কেননা তাদের ফিট থাকতে হবে, যুদ্ধ লাগুক কী নাই লাগুক, থাকতে হবে যুদ্ধের জন্য সদাপ্রস্তুত, তারা যদি এই কায়িকশ্রম দিয়ে গ্রামে বা উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করতো, তবে তাদেরও ঘাম ঝরানো হতো, দেশেরও উপকার হতো। তার দ্বিতীয় পরিকল্পনা হলো সেনাবাহিনীকে অলস বসিয়ে না রেখে তাদের দিয়ে দেশের যুব সমাজকে সামরিক ট্রেনিং দেয়ানো। তাতে দেশ হবে, তার ভাষায়, 'ষোল কোটি সৈনিকের দেশ।' বুঝলাম উবারের ভাষায় সে একজন 'Great Conversationalist'। তাকে আমি পাঁচে পাঁচ রেটিং দিলাম।

আরেকদিন যাচ্ছি আরেক Great Conversationalist এর সাথে। সেও একজন চিন্তাশীল মানুষ। সে ভাবে দেশের দুর্নীতি নিয়ে। তার পরিকল্পনা হলো দুর্নীতিবাজকে নিজের ঘর থেকেই প্রতিরোধ করতে হবে। তার সন্তান তার টাকা নেবে না, বলবে, আমি দুর্নীতির টাকায় পড়াশোনা করবো না। তার স্ত্রী তার শাড়ি গহনা প্রত্যখান করে বলবে, ঘুষের টাকায় কেনা শাড়ি গহনা আমার চাই না। আমি ভাবি এসকল মহান চিন্তাবিদ লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেল, জাতি তাদের প্রাপ্য সম্মান না দিয়ে উবারের মোটরবাইক ধরিয়ে দিল- এটা হতাশার। তাকেও পাঁচে পাঁচ দিব মনস্থ করেছি, সে বলে, আমি কি আপনার কাছে ছয় পেতে পারি? পাঁচে ছয়? আমি জানতামই না প্রতিভাকে কীভাবে সম্মানিত করতে হয়।

একেকদিন একেকপ্রকার মোটরবাইকে চড়ি, কোনদিন হোন্ডা, কোনদিন টিভিএস, কোনদিন বাজাজ, কোনদিন হিরো হোন্ডা, আবার কোনদিন ইয়ামাহা। একেকদিন একেক প্রতিভা। তারা মাথায় চড়িয়ে দেয় একেকপ্রকার হেলমেট। কোনটা দিগন্ত অন্ধকার করে রেসিং মোটরবাইকের চালকের মতো মাথা ও মুখমণ্ডল চেপে রাখে, কোনটি পলকা পাতার মতো উড়ে যেতে চায়।

উবারে আছি বেশ, 'নাই দুঃখ, নাই লেশ'!

______________________________

 

কামরুল হাসান । বাংলাদেশের প্রথিতযশ কবি। ভ্রমণকার। পেশায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।


কলাম এর জনপ্রিয়