Ameen Qudir

Published:
2018-12-06 13:15:12 BdST

প্রতিটি অভিভাবকই একেকজন নির্যাতক: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি টর্চারসেল মাত্র


 



ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল
_________________________________

আমার আজকাল প্রায়ই মনে হয় আমাদের পুরো সমাজটাই শিশুদের জন্য অনুপযোগী। প্রায় প্রতিটি অভিভাবকই একেকজন নির্যাতক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি টর্চারসেল মাত্র।

এখানে বিনোদনও আছে৷ তবে সেটা জেল খানার কয়েদিরা যেমন সন্ধ্যাবেলায় নিয়ম করে গান বাজনা করে সেরকম। বা আর্মিরা মাসে একটা সাংষ্কৃতিক সন্ধ্যা করে সেরকম। তোমার বিনোদনও লাগবে। তাই তুমি এসব করতে বাধ্য।

আজকাল নতুন এক বিপদ যুক্ত হয়েছে৷ 'গুড প্যারেন্টিং' শব্দটা সবাই জেনে গেছে। যেহেতু আজকাল সবাই সনদধারী বাবা মা তাই সবাই নিজেকে শিক্ষিত ও সচেতন মনে করছে। প্রায় সবাই মনে করছে তারা যেটা করছে সেটাই 'গুড প্যারেন্টিং'। এবং সবার উচিত তাদের কাছে শেখা৷ গুড প্যারেন্টিং বা চাইল্ড সাইকোলজি নিয়ে কারো সামান্য পড়াশুনা নেই, জানা শোনাও নেই। চেষ্টাও নেই। নিজে যা ভাবছি তা ই গুড প্যারেন্টিং।

পারিবারিক মূল্যবোধ নামে একটা উদ্ভট জিনিস এদেশে চালু আছে। এদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারই কোন না কোন ভাবে নারী নির্যাতন করে, শিশু নির্যাতনও করে। শিশুরা বড় হয় মিথ্যা ও আতংকের ভেতর দিয়ে৷ ভাত না খেলে ছেলে ধরা নিয়ে যাবে৷ মিথ্যা বললে আল্লাহ জিহবা কেটে নেবে। আইস্ক্রিম খেলে পেটে পোকা হবে ইত্যাদি। আমরা তাই স্বভাবগতভাবেই মিথ্যাবাদী ও ভীতু হয়ে উঠি। দরকার ছাড়াও মিথ্যা বলি। এমনি এমনি বলি।

সন্তানের সামনে বাবা মা বিশ্রী ঝগড়া করে, কেউ কেউ হাতও তোলে। সন্তানের সামনে মায়েরা অপমানিত হয় শ্বশুড়বাড়ির লোকদের হাতে৷ বাংলাদেশের বালিকারা জীবনে প্রথম যৌন নির্যাতনের শিকার হয় পরিবারের গুরুজনদের কাছে। তবু আমরা পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে গলা চড়াই। এই পারিবারিক মূল্যবোধ আসলে কি?

ফেসবুকিং করতে এসে আর ডাক্তারি করতে এসে অসংখ্য মানুষের জীবন কাহিনী শুনেছি। একজন বন্ধু ডাক্তার। খুব সংবেদনশীল একজন মানুষ। তার শৈশবের গল্প শুনলে আমার কষ্টে বুক ভেংগে যায়। মায়ের প্রতি তার প্রবল ঘৃণা। শুরুতে আমার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকেছিল। পরে আস্তে আস্তে বুঝলাম এই ঘৃণা যৌক্তিক। শৈশব থেকেই মেন্টাল ট্রমা নিয়ে বড় হয়েছে৷ মা এর কড়া নজরদারিতে তার শৈশব ধ্বংস হয়েছে। এখন দাম্পত্যজীবনও ধ্বংস হবার পথে। অথচ মায়ের বিশ্বাস তিনি সন্তানের ভাল চান।

সেই বন্ধু একজন মেডিকেল কলেজের শিক্ষক। কিছুদিন আগে বললেন "আমার স্কুলের এক ছাত্রীর নাম আমার মায়ের নামে। আমি ওকে বলেছি তোমার নাম পাল্টাও। ওটা আমার মায়ের নাম। তোমার নাম শুনলে আমি ভয় পাই। স্বাভাবিক হতে পারিনা। "

এক নারী সহকর্মীর বড়ভাই বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে কোন ছেলে নাই। বড়ভাই বিদেশ থেকে মনিটর করে। কোন ছেলে বন্ধু থাকলে তার আপনভাই তাকে গালাগালি করে। তার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড তার ভাইয়ের কাছে আছে৷ আবারো বলছি সেই সহকর্মী একজন প্রাপ্তবয়স্ক ডাক্তার ও শিক্ষক। এই সমাজে খুব সুখী ও সফল মানুষ হিসেবেই ঘুরে বেড়াচ্ছে৷

বাংলাদেশে একটি কথা প্রচলিত আছে। পৃথিবীতে একটিও খারাপ বাবা নেই। লোকে এর সাথে একটিও খারাপ মা নেইও জুড়ে দিয়েছে। হুমায়ুন আহমেদ এই দেশে প্রচুর তরল আবেগসর্বস্ব যুক্তিহীন কথার যোগান দিয়েছেন।

আমি এক ছেলেকে পেয়েছিলাম যে তার বাবা মার নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে।

আমি ছেলেটির সাথে কথা বলে ওকে বোঝাতে চেয়েছিলাম বাবা মায়েরা সব সময় সন্তানের ভাল চান।

ছেলেটি অট্টহাসি দিয়ে আমাকে বলেছিল আপনিও কি বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে একটিও খারাপ বাবা নেই? আপনাকে একটু ভিন্ন ভেবেছিলাম।

আমি স্তব্ধ হয়েছিলাম কিছুক্ষণ। ছেলেটি আমাকে এরপর বলল এগুলো আপনাদের মাইন্ড সেটিং। সব বাবা মায়েরা ভাল হলে এত খারাপ মানুষ এই দেশে তৈরি হলো কি করে?

আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইনি। কিন্তু আমাকে জোর করে ইঞ্জিনিয়ার বানানো হয়েছে৷ আমার বাবাই কি আমাকে হত্যা করেনি? এ কেমন ভাল চাওয়া? আমার শৈশব বলে কিছু নেই৷ প্রতিটা পরীক্ষার পর আমি আতংকে থাকতাম। রেজাল্ট একটু খারাপ হলে আমাকে মানসিকভাবে পিষে ফেলা হবে। ক্রিকেট খেলা আমার ভাল লাগে। আমি ক্রিকেট একাডেমিতে লুকিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার বাবা আমার ব্যট পুড়িয়ে দিয়েছে। হা হা হা। আজকে বলা হচ্ছে আমি মানসিক রোগী। কে বানিয়েছে? আপনিই বলুন।

কথাগুলো আমার চিন্তার জগত নাড়িয়ে দিয়েছে। ছেলেটা বয়সে আমার অনেক ছোট। কিন্তু খুব পরিণত ও স্বাধীন৷ খুব মনে পড়ে ওকে।

___________________________

 

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল । সঙ্গীতশিল্পী। লোকসেবী চিকিৎসক। কলামলেখক।


কলাম এর জনপ্রিয়