|

রাজনীতি'র বলী হচ্ছে আসিফা: এমনকি পূজা,তনু, নুসরাতরাও


Published: 2018-04-19 10:09:22 BdST, Updated: 2018-05-26 00:53:55 BdST

ধর্ষণের শিকার শিশুদের ছবি নয়; এখানে একটি ধর্ষণকান্ডের মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত দের ছবি দেয়া হল। ফাইল ছবি।

 


ডা. নাসিমুন নাহার
________________________________


বলতে সমস্যা নেই আর সব সাধারন বাংলাদেশীর মতো আমিও বরাবরই সেলফ সেন্টারড মানুষ। ঘর সামলে বাইর নিয়ে ভাবি। আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতেও তাই। আর রাজনীতি !! শুনলেই নাট সিটকাই।
সাধারন মানুষ। তাই চিন্তা ভাবনাও সাধারন।

কাশ্মীরের আসিফা'কে নিয়ে কিছু লিখছি না কেন প্রশ্ন করেছেন অনেকে। যেহেতু ফেসবুকে নিয়মিত লেখালেখি করি এই প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। আমার যুক্তি হচ্ছে পূজা,তনু,নুসরাত সহ অসংখ্য নারী, শিশু প্রতি নিয়ত বাংলাদেশে রেপ হচ্ছে। এসব দেখে শুনে আজকাল অসুস্থ বোধ করি। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে একজন পূজা, একজন নুসরাত আমার যতটা চোখের জল ঝরায় একজন আসিফা ততটা ঝরায় না। আমার নিজের ঘরেই তো হিংস্রতা, বর্বরতার কমতি নেই। অন্যের জন্য লোক দেখানো মায়াকান্না আমার আসে না এখন আর।

আসিফা হচ্ছে সেই মুসলিম দেবশিশু যাকে কাশ্মীরে মন্দিরের ভিতরে আটকে রেখে পুরোহিত,পুলিশ সহ কয়েকজন হিন্দু গ্যাং রেইপ করে কয়েকদিন পর শেষে গলা চিপে আর মাথায় পাথর দিয়ে থেঁতলে দিয়ে মেরেই ফেলেছে । পরবর্তীতে পুরো দেশ জুড়ে রাজনৈতিক খেলা শুরু হয়ে গেছে এই রেপ কেসকে নিয়ে।

যতবার নিউজফীডে আসিফার খবর দেখছি ততবারই আমার নিজ দেশের পূজা'র কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে যে হিন্দু বাচ্চা মেয়েটাকে মুসলিম সাইফুল নামের এক লোক রেইপ করার সুবিধার জন্য ব্লেড দিয়ে কেটে বড় করে নিয়েছে বাচ্চাটার প্রাইভেট পার্ট, রেইপ করার সময় গলা চেপে ধরায় যার ব্রেইনে অক্সিজেন চলাচল বন্ধ থাকায় যে অজ্ঞান হয়ে যায় ।
পুরো ঘটনা এতটাই বিভৎস যে কল্পনা করতেও বুক কেঁপে ওঠে।

আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বুঝলাম আসিফা একজন মুসলিম বলেই মূলতঃ তাকে রেপ করা হয়েছে এমন একটা ইস্যু তৈরি করা হচ্ছে। যেন ধর্মীয় বিদ্বেষই আসিফা'র এমন মৃত্যুর মেইন কারন।
আমাদের দেশে যেমন সব রেপ কেসে একমাত্র কারন হিসেবে বলার চেষ্টা করা হয় পোশাক,রাতের বেলা চলাফেরা ইত্যাদি।

সমাজ, দেশ সবকিছুর ঊর্ধে আসল কথা হচ্ছে এটা---- এক একজন শিশুকে রেপ করা হচ্ছে দিনের পর দিন,কখনোবা দলবেঁধে এবং তারপর কুৎসিত হিংস্র পদ্ধতিতে মেরে ফেলছে। অথচ আমরা চিল্লাচিল্লি করছি মেয়েটা হিন্দু না মুসলিম, তার পোশাক নিয়ে।
মেয়েটা যে মানুষ, একজন শিশু তা যেন খুব সচেতনভাবে সাইডে ফেলে রাখার তৎপরতা আমাদের।

পোষাক নিয়ে আর কি বলব? আট মাসের শিশুকেও তো নিস্তার দেয়া হয় নাই আমার দেশে। কি আছে এই তিন,পাঁচ,আট বছরের শিশুদের শরীরে? আসিফা থেকে তনু সবাই তো পা থেকে গলা,মাথা পর্যন্ত কাপড়ে নিজেকে মুড়েও রক্ষা করতে পারেনি।


আর ধর্ম?
আসিফাকে যদি মুসলিম বলেই ধর্ষন করে মেরে ফেলা হয়, তাহলে পুজাকেও কি হিন্দু বলেই এভাবে ব্লেড দিয়ে প্রাইভেট পার্ট কেটে গলা চেপে ধরে রেইপ করা হয়েছিলো ?

আসলে সত্যিই কি পোশাক আর ধর্ম ই দায়ী ওদের রেপ হবার জন্য? নাকি নারী বলেই ; হোক না শিশু, যোনী যেহেতু আছে সেহেতু মানসিকভাবে বিকৃত পুরুষ নামক হায়েনাগুলোর আটকায়নি নির্যাতন করতে।

এখন কথা হচ্ছে কেন এমন মহামারীর মতো বেড়ে যাচ্ছে দেশে, পাশ্ববর্তী দেশে পাল্লা দিয়ে শিশু রেপ?
দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পটভূমি কি দায় এড়াতে পারবে একের পর এক ঘটে চলা এসব অসামাজিক ন্যাক্কারজনক কাজের?আইনের শাসন কতখানি তলানিতে এসে ঠেকলে রেপ কেসের আসামী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে?বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা কতখানি প্রশ্নবিদ্ধ হলে পূজা কেসের আসামী সাইফুল জামিন লাভ করে?

স্বীকার করতে চান বা না চান, দেশের রাজনীতি যত অস্থিতিশীল হচ্ছে আপনার আমার জীবনের নিরাপত্তা,শিশু রেপসহ যখন তখন খুন হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়ছে। চোখ কান বুঁজে আমার মতো রাজনীতি বুঝি না বলে যারা চুপচাপ বসে আছেন তারা আশেপাশে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন কি ভীষন সামাজিক রাজনৈতিক অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা।

পলিটিক্যাল করাপশান এমন একটা বিষয় যা গোটা দেশের আনাচে কানাচে মুহুর্তে প্রভাব ফেলে। রাজনীতির প্রভাব পাড়ার মুদি দোকান থেকে হাসপাতাল হয়ে আপনার আমার ঘর থেকে কর্পোরেট হাউজ সব জায়গায় পরে।
যার প্রভাব শিক্ষা থেকে শুরু করে খাদ্যে ভেজাল, চিকাৎসা দুর্নীতি থেকে অবৈধ ব্যবসা,জন জীবনের নিরাপত্তাসহ সড়ক দুর্ঘটনা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিরাজমান।

রেপসহ প্রশ্নপত্র ফাঁস সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নিমেষেই যদি রাষ্ট্র তা চায়। হুমমম এটাই একমাত্র সত্য। রাষ্ট্র যদি ঝুলিয়ে না রেখে আইনের আওতায় এনে দ্রুত শাস্তির বিধান তৈরি করত তাহলে দিনে দিনে এত দুঃসাহস হতো না অপরাধীদের।
কিন্তু কথা হচ্ছে আমাদের দেশের রাজনীতি এখন রাষ্ট্রের থেকেও বড় হয়ে গেছে দলীয়করণে। দল আগে পরে রাষ্ট্র এবং দলীয় তৈলকরণ পদ্ধতির ধামাচাপায় পিষ্ট এখন রাষ্ট্র। দলের লোকজন অন্যায় অপরাধ করলে রাষ্ট্ তাদের রক্ষা করছে আইনের ফাঁক ফোকর গলিয়ে।আর আমি আপনি চুপ করে থাকি, সব বুঝেও মেনে নিচ্ছি কারন আমরা রাজনীতি বুঝি না বলে নিজেকে বুঝ দেই অথবা আমার সাথে তো ঘটেনি এ ধরনের পলায়নপর মনোভাব নিয়ে। ফলে দিনে দিনে বেড়েই চলেছে দুর্নীতির আখড়া।

যে দেশের রাষ্ট্রনেতা নারী, বিরোধীদলীয় নেতা নারী, সংসদ নেতা নারী , দীর্ঘ সময় ধরে যে দেশের রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে প্রধানত দুটো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায়, সেই দুদলের প্রধান পর্যন্ত নারী----- সেই দেশে নারীদের এমন অবমূল্যায়ন, এত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার দায়ভার কিছুতেই রাজনীতি ঝেড়ে ফেলতে পারে না।
_____________________________

ডা. নাসিমুন নাহার। সুলেখক।

 

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।