|

আমার শারদীয়াবয়স যত বাড়ে, এই অতীত-চারণাও তত বাড়ে


Published: 2017-10-05 20:28:36 BdST, Updated: 2017-11-22 09:55:36 BdST

 

 

 

অধ্যাপক ডা. অনির্বান বিশ্বাস
______________________________

 

বয়স যত বাড়ে, এই অতীত-চারণাও তত বাড়ে।

আমার জীবন মানে এখন এক রকমের মনখারাপের অতীতে ফেরা।অবাক হয়ে আবিষ্কার করি, চার পাশে প্রিয় মানুষ যত আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ,যাঁরা আর ধরাছোঁয়ার মধ্যে নেই । তাদের মধ্যে সবাই-ই যে বয়সে বড়, প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই নেই, এমন তো নয়। কত জন চলে গেছে জীবনের অসম লড়াই লড়তে না পেরে , কত জন মারণব্যাধিতে চিকিৎসা করতে করতে, আবার কত জন হঠাৎ করে এমনি এমনি।

কিন্তু আমি অনুভব করি,এরা সবাই ফিরে আসে শরতের আলো হয়ে, হিম-ছোঁয়ানো বাতাসে । এই ফিরে আসা হয় ঢাকের বাদ্যিতে,দুর্গার মুখে,নতুন জামায়,নাড়কেলের নাড়ু,মুড়কি তে । তারা বোধহয় আমাদের এটাও মনে করিয়ে দেয় যে, এমন সময় আসবে, যখন এই মধুময় ধরণীর ধূলিতে তোমার পায়ের চিহ্ন আর পড়বে না।

শারোদৎসবে আমার কোনও আনুষ্ঠানিকতা নেই। গঙ্গায় যেতে হয় না। পুরোহিতমশাইয়ের দ্বারস্থ হতে হয় না। শরতের আকাশ-বাতাসে ভেসে থাকা অদৃশ্য অতীতের কণাই আমার মন্ত্র হয়ে ওঠে, আমাকে আচ্ছন্ন করে।

আমার বয়স যখন ষোলো-সতেরো, তখন আমার এক রুগ্ন বন্ধু ছিল।দুদিনের পেট ব্যথায়, হাসপাতলে চলে গেল ।আর ফেরেনি। শরৎ এলে সেও ফিরে আসে। এখন আমার সন্তানের মত,সে আটকে আছে সেই কৈশরে। মনে হয়, এই তো এক্ষুনি এসে কড়া নাড়বে। অধৈর্য স্বরে বলবে, ‘কত দেরি করিস দরজা খুলতে,অনি?’

পৃথিবীর বিরল পুত্রসন্তানদের মধ্যে আমি এক জন, মায়ের সঙ্গে যার কখনও ‘ভাব’ হয়নি। বস্তুত মায়ের সঙ্গে এক জীবনে আমার কোনও মতের মিল হয়নি। সে সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি ভালবাসা কিছুতেই না। মায়ের সঙ্গে তর্ক করতে করতেই আমি বড় হয়েছি। আমাদের দুজনের সম্পর্কটা ছিল সমানে সমানে। মা আমাকে যতটা আশ্রয় দিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি তৈরি করে দিয়েছে লড়াইয়ের জন্যে। প্রায় সতের বছর হল, মাএর সঙ্গে আর দেখা হয় না, আর হবেও না। কর্মঠ মা’কে হঠাৎ চলে যেতে দেখে অনেক ভেবেছি , ‘এ সবের অর্থ কী?’

আজ, চলে যাওয়ার পর অর্থটা পরিষ্কার হয়েছে। এখন বুঝতে পারি, আসলে সেই তর্ক, ঝগড়া আর বিবাদই ছিল বন্ধুত্বের নিবিড় প্রকাশ, যে বন্ধুত্ব আর কারও সঙ্গে হবে না কখনও। এই কথাটা আমি দুর্গা মা’কে বলি। জীবনে বলিনি তো কী ! জানি, মা ঠিক শরতের রোদ্দুর হয়ে আসে। এখন আর কেউ নেই, যে গলার স্বর শুনে বুঝে যাবে খিদে পেয়েছে কি না। সত্যি বলছি,এবারে অষ্টমীর অঞ্জলিতে আমি পুষ্পার্ঘ নিবেদনের সময় বলে ফেলেছিলাম,"মা খুব খিদে পেয়েছে !"

চারি দিকে অনুপস্থিত প্রিয় মানুষের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে, যে মাঝে মাঝে নিজেই অবাক হয়ে যাই। সারা বছর ধরেই তারা সঙ্গে থাকে। কিন্তু একেবারে বিনা অনুষঙ্গে, শরতের আলোর রথে তারা এই সময়টায় একেবারে কাছে চলে আসে।

আর আসে শিশুরা আমার কাছে,অনেক আনন্দে,বলে ' ডাক্তার জেঠু,পরীর গল্প বল..সেই যে এক পরী ছিল,দুর্গা তার নাম..." ঢাকের আওয়াজে ওদের কথা শুনতে পাইনা....

ভাবি....

যখন বাতাসে উচ্ছলিত হয় শিশুদের এত খুশি
দেখে অনুভবে চোখ ভেজে বুঝি,
তখন আরতির কাঁসর ঘন্টায় অনুরনিত হয় অর্চনা
বিবিধ স্বরে গয়ে ওঠে আমার অতীত " শোন সব
এ মুক্তির পথ ; এ পূণ্যের পথ "

_________________________

- অধ্যাপক ডা. অনির্বান বিশ্বাস, কলকাতার প্রখ্যাত লোকসেবী চিকিৎসক। কবি, সুচিন্তক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।