|

মানবতার শত্রুরা হারবে, হারবেই কিন্তু বিষের গন্ধ থেকে যাবে বহু দশক ধরে


Published: 2017-09-18 09:49:00 BdST, Updated: 2017-10-22 05:17:55 BdST

 

ডা. রেজাউল করীম

_________________________________

আজকাল যেমন চারিদিকে ধর্মের বান ডেকেছে, আমার ছোটবেলায় সেরকম একবার ধর্মের ঢেউ গ্রাম বাংলায় আছডে পড়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন চলছে, শেখ মুজিবের গলায় বক্তৃতা-এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, দূরাগত গোলার শব্দ আর ছিটকে আসা দুচারটে ফাইটার প্লেনের তীব্র গতিতে আকাশ ফুঁডে যাওয়ার পাশাপাশি আর একটি জিনিস চোখে পড়ার মত আলোড়ন তৈরী করেছিল।

 

এই সময়ে ওয়াহাবী আর সালাফিরা গ্রাম বাংলার নিস্তরঙ্গ ভূমিতে তাদের বিষাক্ত ফনা বিস্তার করতে শুরু করে। আমার দাদাভাইরা সেই সালাফি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। সালাফিদের মতবাদ যে বিশ্ব মানবতার জন্য বড় বিপদ তা আমাদের বার বার স্মরন করিয়ে দিয়েছেন আমাদের পীর-মুরশিদ (শিক্ষক)।

সেদিনের সেই বিষবৃক্ষ বড় হয়েছে আর শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে বাঙালীত্বকেই গ্রাস করতে আসছে। সেদিন যা ছিল চোখের আড়ালে, শাসকের অজান্তে আজ তা শাসকের আশ্রয়, সেদিন যার বিরুদ্ধে বাঙালী বিবেক রুখে দাঁডিয়েছিল, আজ তার পক্ষে বুদ্ধিজীবিদের ভিড়। জানি, মানবতার শত্রুরা হারবে, হারবেই কিন্তু বিষের গন্ধ থেকে যাবে বহু দশক ধরে, যেমন ৪৬ আজো দগদগে ক্ষতের মত বেঁচে আছে। সব কিছু ইতিহাসে লেখা থাকে না, যুগস্মৃতি বাহিত সেই শ্রুতি অন্তরে দোলা দিয়ে যায়। আবার আলোকবর্তিকাও জেগে থাকে বিনিদ্র প্রহরীর মত, যুগসঞ্চিত ব্যাথার মধ্যে থেকেও অক্লেশে বের করে আনে মহত্তর জীবনের সংগীত।

 

সুফি মতবাদ আমাদের জীবনের দর্শন হিসেবে গ্রহন করেন আমার বাবা। খুলনার একজন পীরের শিষ্যত্ব গ্রহন করেন তিনি। সুফি জীবনচর্যা অনাড়ম্বর ও বাহুল্য বর্জিত। জপতপের প্রয়োজন আছে যৎসামান্য। সুফি বিপদে পড়লে বর্জকের মাধ্যমে গুরুর সাহায্য প্রার্থনা করেন (হ্যাঁ, অনেকটা "জলে জঙ্গলে যেখানে বিপদে পড়িবে আমাকে স্মরন করিবের" মত)। ওয়াহাবিদের খুব আপত্তি হল পীরের সাহায্য প্রার্থনা। তাদের মতে এ মূর্তিপূজা। মূর্তিপূজা তো মূর্তিপূজা- এ নিয়ে তাদের সাথে তর্ক করতে চাইনে কারন আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনের তত্ব মাইক্রোকেফালিকদের বোঝানো দুস্কর। ঈশ্বর এক ছিলেন বহু হয়েছেন- এই তত্ব বোঝার জন্য মানুষকে ভালবাসতে হয়- যে তত্ব শুরু হয়েছে মানুষের মুন্ডু কেটে আর ঐতিহাসিক কাবা মন্দিরে কামান দেগে সে তত্বে বোঝার কিছু নেই কিন্তু ভক্তিবাদ বোঝার জন্য মগজাস্ত্রের সাথে মরমী মন ও এক আকাশ উদারতা লাগে- মুরগীর হৃদয় দিয়ে তাকে বোঝা সম্ভব নয়।

উপমহাদেশে সুফি আদিগুরু মস্ত কলন্দর হিন্দু যোগীর কাছে যোগ শিক্ষা করেন। তাই সুফির কাছে ধর্মীয় পরিচয় বড় নয়, ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোটাই বড়। মহারানীর দরবারে পৌঁছানোর হাজার দরজা, যেকোন একটা দিয়ে প্রবেশ করলেই হবে। মসজিদ বা মন্দিরে ঈশ্বরকে বন্দী করে রাখলে তার কাছে একটাই দরজা দিয়ে ঢোকা যায় কিন্তু যিনি দীন-দুনিয়ার মালিক তিনি কি এতই দরিদ্র যে তাঁর উঠোনে একটি বই দরজা নেই।
মহরম মানে আত্ম বলিদান- মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই, যে লডাই অন্ধকার থেকে আলোকে নিয়ে যেতে পারে, যে লড়াইয়ে পতাকা লাগে না, ব্যক্তিপূজা লাগে না, মন্ত্র লাগে না, মৌলবী লাগে না, ঈশ্বর আল্লা যেখানে নিষ্ক্রিয় সত্বা। মানবতাই এখানে শেষ কথা। বহুমুখে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা সেবিছো ঈশ্বর/ জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন্য সেবিছে ঈশ্বর।
"অন্ধকারে দেখতে পায় না, তর্ক করে — এ বাণী ভয়ার্তের মায়াসৃষ্টি,
আত্মসান্ত্বনার বিড়ম্বনা।
বলে, মানুষ চিরদিন কেবল সংগ্রাম করবে
মরীচিকার অধিকার নিয়ে
হিংসাকণ্টকিত অন্তহীন মরুভূমির মধ্যে।" কিন্তু এখানে কোন মানবজমিন শেষ হয় না।
"মেঘ সরে গেল।
শুকতারা দেখা দিল পূর্বদিগন্তে,
পৃথিবীর বক্ষ থেকে উঠল আরামের দীর্ঘনিশ্বাস,
পল্লবমর্মর বনপথে-পথে হিল্লোলিত,
পাখি ডাক দিল শাখায়-শাখায়।
ভক্ত বললে, সময় এসেছে।" (শিশুতীর্থ)

________________________________

ডা. রেজাউল করীম। পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত চিকিৎসক , কবি , সুচিন্তক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।