|

মানহীন ডাক্তার তৈরীর ওপেন কারখানা


Published: 2016-12-18 10:31:33 BdST, Updated: 2017-10-22 05:16:26 BdST

 

 

 

 

ডা. শিরিন সাবিহা তন্বী

_____________________________


পাবলিক ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট এক রিলেটিভকে নিয়ে রেষ্টুরেন্টে গেছি।কম বয়সী আলট্রা মর্ডান,কিম্ভুত সাজগোজ আর অফেনসিভ আচরনের এক মেয়ে ঢুকল।এতটাই অবজেকশনাবল এটিচুড মেয়েটির যে বিরক্তিটা লুকোতে পারলাম না।আত্মীয়া হাসল।মেয়েটি চলে গেলে বলল,ঐ মেয়েটি ওদের স্কুলের ক্লাসমেট।বিশাল বড়লোকের মেয়ে।ওকে নিয়ে মাঝে মাঝেই স্কুলে বিচার বসত।একেবারেই পিছনের কাতারের ছাত্রী।SSC,HSC - দুটোতেই রেজাল্ট খারাপ।কিন্তু মেয়েটি রিসেন্টলি একটি জেলা শহরের কোন এক প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে।আমার আত্মীয় বলল,ওদের ব্যাচের ফার্স্ট,সেকেন্ড,থার্ড তিনজন ই সরকারী মেডিকেলে।ওরাও ডাক্তার হবে আর এই মোষ্ট ফালতু মেয়েটাও ডাক্তার হবে??
মনটা খারাপ হলো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সমস্যা অনেক।তবে ডাক্তারদের প্রতি পুরো সমাজের সম্ভ্রমের এটিচুড টা বদলে গত কয়েক বছরে তাচ্ছিল্যে পরিনত হওয়ার প্রধান বা অন্যতম কারন এই প্রাইভেটাইজেশন অব মেডিকেল এডুকেশন।
আমার মনে আছে ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট সপ্তাহে মেডিসিন ক্লাবে সিনিয়র এক ভাইয়া হাতে নখ রেখেছি বলে কটু কথা বলায় আজ ও নখ রাখি না।আমাদের সকলের ছোটবেলার গল্পগুলোও গৌরবের।স্কুলকে বার বার সম্মানিত করা,বোর্ডে স্থান পাওয়া ছাত্র ছাত্রীরাই কেবল ডাক্তার হবার সুযোগ পেত বলে সাধারন মানুষের সাইকোলজিটাই এমন ছিল যে তারা ডাক্তারদের সম্মান করত।আর ভর্তি পরীক্ষায় ফেল মেরেও কেবল বাপের অবৈধ টাকার বিনিময়ে যখন এই সকল বিতর্কিত চরিত্ররা ডাক্তার হচ্ছে সাধারন মানুষ ই তাদের রিজেক্ট করছে।
এদের প্রধান সমস্যা - এদের মেধা নাই,টাকা বেশী আছে,টাকায় কেনা সার্টিফিকেট আছে!অনেকে তাই অটোবায়োগ্রাফী লিখে লিখে চিকিৎসক লেখক হচ্ছে।কেউ বাবার ক্লিনিক এ এমডি হয়ে হম্বিতম্বি করে প্রশাসক হচ্ছে।কেউ দুটো কথা গুছিয়ে বলতে পারে না - চিকিৎসক রাজনীতিবিদ হচ্ছে !!এরা আসলে আমাদের দীর্ঘদিনের মেধাবীদের গেট টুগেদারের এই পেশাটাকে কলংকিত করেছে।ক্লাসের সবথেকে ফালতু নামে খ্যাত ছাত্র/ছাত্রীটি ফ্যাশন নিয়ে কাজ করুক।দক্ষ বিউটিশিয়ান হোক,ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এ ঢুকুক।কেন তাকেও ডাক্তার হতে হবে??আর কেন কেবল টাকার বিনিময়ে সকলের ডাক্তার হবার সুযোগ থাকবে??
এখন প্রতিরক্ষা বাহিনী ওপেন প্রজ্ঞাপন দেয় বেসরকারী থেকে পাস করা ডাক্তাররা আবেদন করার ই যোগ্য না।আজকাল প্রায় শতভাগ বেসরকারী মেডিকেল কলেজ সরকারী মেডিকেল করেজ ছাড়া শিক্ষক নেন না।
এই দায় দায়িত্ব এই অপমানের দ্বায়ভার কি রাষ্ট্রের না??কেন এতটুকু একটা দেশে মানহীন সত্তরটি বেসরকারী মেডিকেল কলেজ??যে ডাক্তারের হাতে রুগীর জীবন মরন, কেন কিছু লোভী ব্যবসায়ীদের অনুমোদন দেয়া হলো মানহীন চিকিৎসক তৈরীর???
কষ্ট লাগে তাদের জন্য যারা সত্যিকারেই যোগ্য।দুর্ঘটনাবশত চান্স পায়নি।এরা অযোগ্যদের মত নয়।এরা বিনয়ী।পেশার প্রতি আন্তরিক।এবং অকারন মিথ্যা গপ্প আর বায়োগ্রাফি শো করে না।সরকারী মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা ডেন্টিষ্টদের যখন এদের বলতে শুনি - ডেন্টিষ্টরা আবার ডাক্তার নাকি?আর চল্লিশ হাজার সিরিয়াল থেকে শুধু টাকা আর পাওয়ার এক্সারসাইজ করে যখন নিজেদের সুপার হিরো ভাবতে দেখি সত্যি রাগ লাগে।
DMC/SSMC/CMC/SBMC র মত করে যখন এরা বলে ULBMMC বা ABCDDMC বা BMCDHMC তে ডাক্তারী পড়ি।তখন হাসব না কাঁদব ভেবে পাই না!
এ অবস্থার পরিবর্তন এখুনি দরকার।মানহীন মেডিকেল কলেজ আর মানহীন স্টুডেন্ট পরিহার করুন।ভর্তি পরীক্ষায় দশ হাজারের পরের সিরিয়ারদের অযোগ্য বিবেচনা করা হোক।
পাঁচ থেকে দশটি বেসরকারী মেডিকেল কলেজ থাকুক।দরকার হলে সরকার তাদের রেগুলার মনিটরিং করুক।
নতুন তৈরী হওয়া সব মেডিকেল কলেজে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা দিয়ে হলেও যোগ্য এবং আন্তরিক শিক্ষক নিয়োগ দিক।
সারা বিশ্ব যখন জ্ঞানের এক্সারসাইজ হয় - আমরা দুর্নীতি,কালো টাকা আর পাওয়ার এক্সারসাইজ করি।আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে তথা নবীন চিকিৎসকদের যোগ্য করে তুলবার দায়িত্ব আমাদের এবং সরকারের!
তাই অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে মেডিকেল শিক্ষার অনিয়ন্ত্রিত প্রাইভেটাইজেশন আর সরকারী মেডিকেলে শিক্ষক স্বল্পতার এই দুর্দিন থেকে মেডিকেল শিক্ষাকে মুক্ত করুন।মেডিকেল শিক্ষাকে ব্যবসায়ীর হাতে দিয়ে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত তো হয় ই নি।সাধারন মানুষ শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা হারিয়েছে সত্যিকারের মেধাবীদের প্রতি।
এই অবস্থার উত্তরন করুন।যে যার জায়গা থেকে আন্তরিকতার সাথে এই বিষয়ে কথা বলুন।এবং সত্যিকারের যোগ্য চিকিৎসক ছাত্রদেরকেই এই দেশের চিকিৎসা পেশার হাল ধরার মত যোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলুন।
আমার দেশের এমনকি আমার মেডিকেলের বহু চিকিৎসক আমেরিকাতে/ লন্ডনে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।ঐ দেশের ছাত্র পড়ান।তাহলে যারা আজকের ছাত্র এমন উজ্জল ভবিষ্যতের স্বপ্ন তাদের জন্য নয় কেন?
___________________________

 

লেখক ডা. শিরিন সাবিহা তন্বী । মেডিকেল অফিসার, শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
জনপ্রিয় লেখক। নিয়মিত ডাক্তার প্রতিদিনে লেখেন।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।