Ameen Qudir

Published:
2018-11-17 07:15:46 BdST

মেডিকেল ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কত অনন্য মধুর হতে পারে, জানালেন কথাশিল্পী চিকিৎসক


 


ডা. রাজীব হোসাইন সরকার
_____________________________

___ তিনি স্মার্ট ছিলেন না।
মাইক্রোবায়োলজির দুর্বোধ্যতার মতোই তিনিও ছিলেন দুর্বোধ্য। তিনি পাশ করানোর চাইতে ফেইল করাতেন বেশি। কাউকে টার্গেট করলে তাকে লাগাতার ফেইল করাতেন। ঘোষণা দিয়ে কোন শিক্ষক স্টুডেন্টদের ফেইল করাতে পারে এমন বিরলপ্রজাতির শিক্ষক তিনি। তার কথা মনে হলেই মেডিকেলের থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্টরা দুঃস্বপ্ন দেখত।

তিনি স্মার্ট ছিলেন না।
কারণ তিনি আয়রণ করা প্যান্ট পরতেন। পোলো শার্ট আয়রণ করে ইন করতেন। সেখানে কখনো ভাঁজ পড়ত না। রুচিবোধ সবার থেকে আলাদা। তবুও সবকিছুর ভাঁজে ভাঁজে ছিল তার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভয়। কারণ তিনি যা বলেন তা করে ফেলেন। কোন লবিং তার উপরকাজ করত না।

তিনি স্মার্ট ছিলেন না।
উপস্থিতি কল করতেন ল্যাপটপে। সেখানে তিন শ্রেণির বসবাস। যাদের উপস্থিতি শতভাগ বা কাছাকাছি, স্যার তাদের কথা দিয়েছেন, মাইক্রোবায়োলজি ভাইভাবোর্ডে পার করে দিবেন। ঝড়-বন্যা কিঙ্গা সুনামি আসলেও তাদের পাশ কেউ আটকাবে না।
যারা হলুদ জোনে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েই পার পেতে হবে৷ ভাগ্যগুণে পার পাবার সম্ভাবনা নেই।
যাদের উপস্থিতি মিনিমাম পর্যায়ে তারা ছিল রেডজোনে। তাদের পার পাবার সুযোগ নাই। প্রফে পাশ করার আকাঙখা তাদের রাখা নিষিদ্ধ ব্যাপার। তিনি কড়া হুশিয়ারি দিয়েছেন। যত মেধাবীই হোক না কেন, সে পাশ করবে না।

তিনি স্মার্ট ছিলেন না।
কিন্তু আমি ছিলাম স্মার্ট। কারণ স্যারের তিন কালারের উপস্থিতি লিস্টে আমি ছিলাম রেডজোনে। যেহেতু আমার পাশ করার সম্ভাবনা নেই তাই স্যারের অধিকাংশ ক্লাশের সময় আমি ঘুমিয়ে থাকতাম। অথবা কলেজে আসলেও স্যারের ঝাড়ি খাবার ভয়ে ক্লাশে আসতাম না। কারণ স্যার স্মার্ট ছিলেন না।
আমি ছিলাম স্মার্ট।

তিনি স্মার্ট ছিলেন না।
কিন্তু পাকেচক্রে তিনি আমার ফেসবুক একাউন্টে ফ্রেন্ডলিস্টে ছিলেন। আমার লেখা পড়তেন। খুশি কিংবা অখুশি হলে সেখানে কমেন্ট করতেন। কিন্তু তিনি কখনোই বুঝতে পারেননি, আমি থার্ডইয়ারে। তার ক্লাশের ছাত্র৷ কারণ তিনি স্মার্ট ছিলেন না। আমি ছিলাম স্মার্ট।

একদিন ক্লাশে এসে তিনি আমার নাম ধরে ডাকলেন৷ ক্লাশের একশ সাতাত্তর জনের মাঝে সেদিন ছিলাম না। তিনি আমাকে চেম্বারে ডাকলেন। রুমমেটের কল্যাণে খবর চলে গেল আমার কানে। রেডজোনের স্টুডেন্ট। মৃত্যুসম দুশ্চিন্তা।

আমি একাএকা স্যারের চেম্বারে দেখা করতে গেলাম। স্যার আমাকে দেখে হাসিমুখে বললেন,
-সামনে কলেজ ডে। একটা থিমসং লেখো। সেটাকে রেকর্ড করা হবে।

স্যার আমাকে বলেছিলেন কারণ আমি ছিলাম স্মার্ট।

আমি গান বা কবিতা লিখি না। যাও লিখি সেগুলো ছেলেমানুষি। শেষ পর্যন্ত সেটা লিখে ইন্সট্রুমেন্টে কাভার করে ফেলল বন্ধু বেঞ্জামিন।

স্যার স্মার্ট ছিলেন না। কারণ
রেডজোনের একটা ছেলের সাথে অসমবয়সী একজন শিক্ষকের ক্লাশের আড়ালে বন্ধুত্ব শুরু হল। বন্ধুত্বের গভীরতা সম্পর্কে লিখতে পারছি না। পুরো অব্যাখ্যেয় ব্যাপার। বন্ধুত্বের জেরে তিনি আমাকে তার বাসায় নিমন্ত্রণ করেও ফেললেন। যে লোক টানা ছয়বার কোন মেডিকেল স্টুডেন্টকে ফেইল করান ঘোষণা দিয়ে, সেই স্যারের সাথে আমার মত মধ্যমশ্রেণির একজন ছাত্রের বন্ধুত্ব অস্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আমরা বন্ধু ছিলাম। কারণ স্যার স্মার্ট ছিলেন না।আমি ছিলাম স্মার্ট।

স্যার সত্যিই স্মার্ট ছিলেন না। কারণ, একদিন আমি কলেরা নিয়ে একটা মজার পোস্ট লিখলাম। স্যার সেখানে আচমকা একটা কএম্নট করে বসলেন৷ কখন প্রস্রাবে কলেরার জীবানু পাওয়া যায়? কোয়েশ্চের পাশেই লিখলেন এটা আমার ফাইনাল পরীক্ষার প্রি-ফিক্সড প্রশ্ন।
আমি দুইদিনেই প্রায় ছয় ধরণের কারণ বের করে ফেললাম, যখন প্রস্রাবেও কলেরার জীবানু (ভিব্রিও কলেরি) পাওয়া যায়। কারণ আমি ছিলাম স্মার্ট।

রেডজোনের ছাত্র প্রফে ভাইভা বোর্ডে বসল। স্যার নেই। তিনি তখন ভ্যালোরে। মেরুদন্ডের চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমি তার করা ভাইবার প্রিফিক্সড প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বোর্ডে বসে আছি, তিনি নেই।
আমাকে প্রশ্ন করলেন মেডিকেল সবচাইতে লজিকলেস শিক্ষক যিনি আদৌ জানতেন না প্রফের বোর্ডে ছাত্রদের প্রশ্নের একটা সিকুয়েন্স রাখলে উত্তর দেওয়া সহজ হয়। শুরুতেই একটা বিদঘুটে প্রশ্ন করে আমাকে আটকে দিলেন। আমার মাথায় তখন কলেরার জীবানুর ছয়টি আলাদা উত্তর খেলা করছে। আমি দেখতে পাচ্ছি আমার ফেইল হয়ে যাচ্ছে, পাশ করার কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছি না। থট ব্লক। আবার যেগুলো পারছি সেগুলো অসম্পুর্ণ।

শেষে জনৈক শিক্ষক আমাকে প্রশ্ন করলেন, বলোতো, কখন ইউরিনে কলেরার জীবানু পাওয়া যায়?

প্রশ্নটা এত আকস্মিক ছিইল যে আমি চন্দ্রাহত হলাম। কী করব বুঝতে পারছি না। কারণ এটিই আমার শেষ প্রশ্ন। দাবার চাল উল্টে দিতে এর চাইতে মোক্ষম চাল আর নেই। আমি ধীর লয়ে উত্তর দিতে শুরু করলাম। স্যারের চোখেমুখে বিস্ময়। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় কিন্তু এত বেশি তথ্য দেওয়া অসম্ভব। এক্সটার্নাল আমার উপস্থিতিতেই বুঝিয়ে দিলেন-আমি পাশ।

একজন রেডোজোনের স্টুডেন্ট পাশ করে গেল। কারণ সে ছিল স্মার্ট। সে ফেল করেনি। যদিও একজন 'স্মার্ট নয়' শিক্ষক ভরাক্লাশে বলেছিল, রেডোজোনের স্টুডেন্টরা কোনোদিন একবারেই পাশ করে না।

ভাইভা দিয়ে বের হলাম। জনৈক শিক্ষক ডাকলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'মশিউর স্যার কেমন আছেন?'
স্যারের কলিগ যখন তার অধস্তন ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করেন -কলিগ কেমন আছে, তখন বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, ভাইভাবোর্ডের শেষ প্রশ্নটি মেরুদন্ডের জটিল রোগে আক্রান্ত একজন বিছানায় আবদ্ধ, দাড়াতে না পারা শিক্ষক শত কষ্টের মাঝেও তার কলিগকে জানিয়েছেন। একজন রেডজোনের ছাত্রকে রক্ষা করতে। একজন বন্ধুকে রক্ষা করতে।

ব্যাপারটি হতভম্ভ করে দেবার মত...অনাকাঙ্খিত বজ্রপাতের মতোই।

আমি বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করলাম, তিনি স্মার্ট না। তিনি কখনই স্মার্ট ছিলেন না। তিনি ছিলেন- স্মার্টেস্ট।

ওপারে ভালো থাকবেন প্রিয় বন্ধু, ওপারে ভালো থাকবেন প্রিয় শিক্ষক, ওপারেও স্মার্টেস্ট থাকবেন...

[স্যারের সেই প্রিফিক্সড প্রশ্নটি কমেন্টে স্ক্রিনশট আঁকারে দিয়েছি]
____________________________

ডা. রাজীব হোসাইন সরকার । সুলেখক।


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়