|

বইকুণ্ঠের জার্নাল :বাংলাটাও ঠিকমত শিখেছি কি


Published: 2017-09-05 11:09:42 BdST, Updated: 2017-12-18 16:44:12 BdST

 

ডা. অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

____________________________


আমার ভাষা অজ্ঞতা নিয়ে অনুভব করছি দু'কলম লেখার সময় হয়েছে। খুব সম্প্রতি আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ( এবং লেখার গুণপনা ও পাণ্ডিত্যে ঈর্ষাভাজনও!) দু'জনের কাছে কিঞ্চিৎ ভর্ৎসিত হয়ে এ'টি মনে হল।
আমি বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় সাবলীল নই। (বাংলাটাও ঠিকমত শিখেছি কি?)

যে কারণে বাংলা অনুবাদে ছাড়া বিদেশী সাহিত্য আমার পড়াই হয়নি। বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্য সেই ভাষাতেই না পড়াটা অমার্জনীয়। এই ব্যাপারে আমার সর্বজনবিদিত আলস্য ও পল্লবগ্রাহিতা দায়ী। যতই আমি এই ঘটনাটা ছদ্ম ভাষা-অস্মিতার একটা কাল্পনিক আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখি, এ'টা যে খামতি তা' অনস্বীকার্য।
কী হয়েছি, কী হতে পারতাম ইত্যাদি হা'হুতাশে আকীর্ণ হতে মন চায় না। হয়ে লাভও নেই। কিন্তু তার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা ও কনফারেন্সে ঠোক্করও কম খাইনি। এখনও খাই।


এ'বারে, না ঠিক অজুহাত নয়, ইংরেজিতে অস্বস্তির কারণটা ব্যাখ্যা করি। বাড়িতে প্রাথমিক ইংরেজি অক্ষরজ্ঞানের বাইরে আমাকে শেখানো হয়নি। চতুর্থ শ্রেণী অবধি পাঠ্যসূচীতে না থাকা ভাষাটি পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তির সময়ে ( সন ১৯৬২) প্রথম বুঝলাম দরকারি। জুনিয়ার হাইস্কুলে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্ন করা হয়েছিল ডাংকি শব্দের অর্থ। উত্তর দিয়েছিলাম বাঁদর। স্যার বললেন, ভর্তি নিচ্ছি। তবে বুঝলাম তুই দু'টোই।
স্যারের আশীর্বাদ বিফলে যায়নি।
নবম শ্রেণী থেকে একাদশ শ্রেণী( মানে পুরানো হায়ার সেকেন্ডারি… সন ১৯৬৯) ইংরেজি শেখার বারোটা বেজে গেল। কোন ইংরেজি টেক্সট বই পাঠ্য ছিল না। অর্থাৎ প্রকৃত ইংরেজদের লেখা সাহিত্য পড়ার সুযোগ পাঠ্যসূচীতে ছিল না। দু'শ নম্বরের বিস্তৃতি ছিল তথাকথিত 'আনসীন' অর্থাৎ, প্রেসি, ডায়ালগ, লেটার রাইটিং, এসে, অ্যানালিসিস, ট্রানশ্লেসন, স্টোরি রাইটিং ইত্যাদি বহুতর ব্যাপার যে'টি আমার সেই মফসসলের বিদ্যালয়ে শিক্ষক মশাইরা চাইলেও অতি চালাক আমি ভেবেছিলাম 'I go, you know' গোছের ইংরেজি দিয়ে ওই যাকে বলে স্টেজে মেরে দেব। যে সাহায্য করতে পারত, পি কে দে সরকারের সেই অমোঘ বইটির হাতও ধরিনি অশেষ সাহসে।
ফল যা ফলবার… ফলল। প্রি টেস্টে ইংরেজিতে দু'শয় বিরানব্বই। টেস্টে বিরানব্বই। হায়ার সেকেন্ডারিতেও তাই। ভাবলাম গেরো কাটল। আসলে কাটেনি। ডাক্তারি পড়ার শুরুতে প্রি মেডিক্যাল নামের অর্থহীন একবছরের পড়ায় আবার ইংরেজি।


কী আশ্চর্য, এ'বারেও বিরানব্বই, মোট দু'শতে। বাবা বললেন, তোর আর ইংরেজিটা শেখা হল না।
বলতে ভুলেছি ডাক্তারিতে ঢুকতে সেই সময় ইংরেজিতে ন্যূনপক্ষে শতকরা ৪৫ পেতেই হত।
আমি পেয়েছিলাম দু'শয় বিরানব্বই মানে ৪৬%। কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেছি।
এ'বারে স্বীকার না করলেই নয়, ইংরেজির সাথে যে'টুকু চেনাজানা তা' ঘটল ডাক্তারি পড়তে গিয়ে। অর্থাৎ, আর্টারির ব্রাঞ্চ থাকে ভেইনের ট্রিবিউটারি। পরে জানলাম নদীরও তাই। ট্রিবিউটারি তাকে তৈরি করে। সে আবার ভেঙে যায় ব্রাঞ্চে।
কিন্তু সেই শেখাটাতো দায়ে পড়ে শেখা, ভালোবাসায় শেখা নয়। কাজেই এ'জীবনে মিটিল না সাধ। না ইংরেজি ক্লাসিক, না অ্যাসিমভ না হ্যারি পটার।


একটা মজার কথা এইখানে বলি। মেডিকেল কলেজে আমাদের ক্লাসে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনো করা অনেক ছেলেমেয়ে ছিল। তারা প্রায় সবাই বাঙালি হলেও অনেক সময়েই নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলত। কিন্তু কী আশ্চর্য, সেই ছেলেমেয়েগুলোই, আবার সবচেয়ে ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীতও গাইত।
মধুমতীর গলায়, দূরের তীব্র বাঁশির মত বেজে উঠত,
বাজে করুণ সুরে।
কলেজ সোশ্যালে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে ভাস্কর অনায়াসে ধরে ফেলত কোথায় কড়ির বদলে কোমল লাগল।
আসলে আমার নিম্ন মধ্যবিত্ত বেড়ে ওঠার আবহেই ছিল ব্যক্তিগত যত্ন আর অনায়াস শিল্প সুষমার অভাব।
এখনও সেই অভাবেই হয় তো নিজের একধরণের হীনমন্যতাকে সাজিয়েছি ভাষা-অস্মিতা বা প্রাদেশিকতায়। বাংলার চৌহদ্দিতেই থাকি বলে, ঝাঁ চকচকে শপিং মলে, পাঁচতারা হোটেলে, দায়ে পড়ে যাওয়া কর্পোরেট অফিসে, কিছুতেই ভাঙা ভাঙা হিন্দি-ইংরেজিতে কথা বলি না। আর আমার আউটডোরে বা ইনডোরেও, আমাকে কিছুতেই বোঝানো যায় না ইচ্ছে করে হিন্দিতে বলা কোনও কথা।
এই হচ্ছি অত্যন্ত প্রাদেশিকতায় সঙ্কীর্ণ আমি। গর্বিত আর লজ্জিত আমি।
আমাকে ক্ষমা করবেন না ত্যাগ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনার। হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি

_______________________________

ডা. অরুণাচল দত্ত চৌধুরী , কবি , সুলেখক।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।