|

সাংবাদিকের মুর্খামিরও একটা সীমা আছে !!


Published: 2016-12-25 23:32:44 BdST, Updated: 2017-04-27 17:00:29 BdST

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল

___________________________________
সাংবাদিক ঝরনা মনির অভিযোগ পড়লাম। পড়ে আমার প্রশ্ন হল,

দুনিয়াতে এমন কি এন্টিবায়োটিক আছে,এমন কি ঘুমের ওষুধ আছে যা খেলে শিরা শুকিয়ে যায় জানতে মন চায়।
কি সেই এন্টিবায়োটিক! যা খেয়ে চোখের লেন্সও গেল! প্লিজ ওষুধের নামটি বলুন।

মূর্খামিরও তো একটা সীমা আছে! লেখাটা পাবলিশ করবার আগে কোন চিকিৎসক বা নিদেন পক্ষে ফার্মেসী পড়া কোন বন্ধুকে তো অন্তত দেখিয়ে নেওয়া যেত।

লেখাটিতে বিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণের যে ভুল চোখে পড়ল তাতে এদেশের সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ 'সুলতান সুলেমান পরবর্তী নাট্যকর্মীদের' মত বলেই মনে হচ্ছে।
__________________________

লেখক ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল রেসিডেন্ট , বিএস এম এমইউ, ঢাকা।

 

সাংবাদিক ঝরনা মনি যে অভিযোগ করেছিলেন __________________


ছোটবেলায় থেকেই খুব মাথা ব্যথা। মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যেতাম। প্রচুর ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কিচ্ছুটি হয়নি। গত দেড়যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, মিডফোর্ড, মেডিনোভা, স্কয়ার, পপুলার, ল্যাবএইড, হেলথ এন্ড হোপ, পদ্মা, আলবেরুনী, আল-রাজী, গ্রীণলাইফ, গ্রীণভিউÑ যে যেখানে বলেছেন, সেখানেই ছুটে গিয়েছি।দিনের পর দিন আইসিডিডিআরবিতে হাজারো টেস্ট করিয়েছি। সমাধান তো হয়ই নাই বরং মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো যুক্ত হয়েছে ভয়ংকর এ্যালার্জি, নাক-কান-গলায় সমস্যা, চোখে সমস্যা!

জুলাইয়ে সমস্যা আরো প্রকট হয়। বিকাল হলেই তীব্র মাথা ব্যথা। চোখ ব্যথা। দেখতে না পাওয়া। এলো ২ আগস্ট। জীবনের এক ভয়াল দিন। কাজের মধ্যেই কোনো এক সময় বাম পাশের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলো। অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তায় পড়ে গেলাম। কিছু মানুষ নিয়ে এলেন এক ফার্মেসিতে। হাই প্রেশার, বমি, বাম পা অবশ। এই অবস্থায় বাসায় ফিরলাম। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রান্নাও করলাম। রাত একটায় ফোন দিলাম বোনকে Snigdha Sarker Chini (নিউরোলজিস্ট) ও বললো, দিদি কিচ্ছু হয়নি, মধু খা, মনে হয়, ব্রেনে অক্সিজেনের অভাব হয়েছে। সকালে ডাক্তার দেখিয়ে ফোন করবি। আমি জানি, আমার বোনটি তখন আমাকে নিয়ে অনেক টেনশন করছে। কিছুক্ষণ পর চীন থেকে ফোন করলো ছোট Arlene Smita Sarker সেও খুব টেনশনে। পরদিন মেডিক্যালে গেলাম। ডাক্তার বললো, কিছুই হয়নি। কতগুলো ব্যথানাশক ওষুধ আর বমি বন্ধের ওষুধ নিয়ে বাসায় চলে এলাম। আমি পা ফেলতে পারি না। তীব্র ব্যথায় কাঁদি। ফেসবুকে জানালাম ছোটভাই ‘ম্যাজিক ডাক্তার’ সাফিকে Shafi Uddin Ahmed । সাফি তখন অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণে । মর্মাহত সাফি বললো, দুই সপ্তাহ পরে দেশে ফিরছি।ব্যথায় কুঁচকে যাওয়া পা টি ঘরের সকল রশি আর ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখি জানালার গ্রিলের সঙ্গে। (কি করবো আমি!) ঠিক দুই সপ্তাহ পর থেরাপীর অনেকগুলো যন্ত্রপাতি নিয়ে বাসায় হাজির ম্যাজিক ডা.। তখনই জানলাম, আমার বামপাশের মূল শিরাটি (যা দিয়ে রক্ত ও অক্সিজেন পাস হয়) অকেজো। ব্যথার কারণ এটিই। থেরাপী শুরু হলো। এক মাস ২৩ দিন পর বাম পায়ে আবার রক্ত সঞ্চালন শুরু। (ভয়ংকর ওইদিনগুলোর কষ্ট কতপ্রকার ও কি কি- তা কেবল আমিই জানি।)

নভেম্বরে গেলাম কলকাতায়। পুরো কেস হিস্ট্রি লিখে দিল ডা. সাফি। কলকাতার নিউরোলজিস্ট খুব যত্ন সহকারে ঘন্টার পর ঘন্টা আমার কথা শুনলেন। বিভিন্ন টেষ্ট, ইনজেকশান, এমআরআই- সব রিপোর্ট করানো হলো। রিপোর্ট হাতে পেয়ে তো আমার চিকিৎসকের চক্ষু চড়কগাছ! কি করে সম্ভব! চার সিনিয়র নিউরোলজিস্ট আমাকে নিয়ে বোর্ড বসলো। তারাই জানালেন, আমার মূল শিরার একটি পাওয়া যাচ্ছে না। একটি শিরা দিয়ে বাম অংশের ব্লাড ও অক্সিজেন সাপ্লাই সম্ভব হয় না। আবার টেস্ট, আবার তীব্র ইনজেকশন আবার এমআরআই। অনেক কষ্টে বদমাশ শিরাটিকে যদিও পাওয়া গেল, কিন্তু এত সরু আর এত বেশি ক্রিটিক্যাল যে আমার চিকিৎসকরাই উদ্বিগ্ন।
কিন্তু এর কারণ? আমার তো জন্ম থেকে এরকম হয়নি? তাহলে? কলকাতা ও চেন্নাইয়ের চিকিৎসকরা বলছেন, এজন্য একমাত্র দায়ী ভুল চিকিৎসা। মাইগ্রেনের জন্য দেড়যুড় ধরে আমাদের নিউরোলজিস্টরা আমাকে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ খাইয়েছেন। এল্যার্জির কারণের চিকিৎসা না করে দিনের পর দিন এন্টিবায়োটিক খাওয়ানো, পেইন কিলার খাওয়ানোর রেজাল্ট। আজ জীবন দিয়ে এর ফল ভোগ করছি আমি! আমার এ্যালার্জির ডক্টর ইউ কে ভোরা (পাঞ্জাবি ভদ্রলোক, যাকে আমি বেটা বলেই ডাকি।) তো রেগেমেগে বললেন, ‘বাবা, তোমাকে যারা দিনের পর এ্যালার্জির চিকিৎসার নামে এন্টিবায়োটিক খাইয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে না কেন? মানুষকে ভালো না করতে পারলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার অধিকার কে দিয়েছে তাদের?’

শঙ্কর নেত্রালয়ে ডা সপ্তর্ষিদার Saptarshi Dasgupta নেতৃত্বে তিনজন সিনিয়র ডক্টর আমাকে দেখছেন। দুইমাস পর ডানচোখে অপারেশন হবে। যিনি অপারেশনে নেতৃত্বে দেবেন, সেই ডক্টরও (অবাঙালি ভদ্রমহিলা) জানালেন, ডানচোখের লেন্সটির ক্ষতির কারণ ভুল ওষুধ!

আমি বা আমরা যাবো কোথায়? দেশের মানুষ ডাক্তারদের সেকে- গড মনে করেন। আর কিছু ডাক্তারের (!) এমন চিকিৎসা সেবার কারণে আমরা দাঁড়িয়ে আছি জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এর দায় কে নেবে? একজন ডক্টর তার ক্লিনিকে দুই মিনিটও রোগীর কথা শুনেন না, গাদা গাদা টেস্ট আর এন্টিবায়োটিক হাতে ধরিয়ে দেনÑ এরই নাম চিকিৎসা সেবা! আর পার্শ্ববর্তী দেশের ডক্টররা চেম্বারে ঘন্টার পর ঘন্টা রোগীর কথা শুনে রোগের কারণের চিকিৎসা করেন, রোগের লক্ষণের নয়। এরপর যদি কেউ আমার মতো একটু সুস্থভাবে বাঁচার জন্য ভিসা, পাসপোর্টের বিশাল ঝক্কি ঝামেলা মিটিয়ে অন্য দেশে গিয়ে চিকিৎসা করান, সেটি কি অন্যায়?

শেষ কিংবা শুরুর কথা : কলকাতার চিকিৎসকরা আমাকে তিনমাস অবজারভেশনে রেখেছেন। ভেইনটি সচলের জন্য ওষুধ চলছে। পাশাপাশি চলছে ম্যাজিক ডাক্তারের থেরাপী। অবশ্য আমি ওকে মুন্নাভাই এমবিবিএস বলেও ডাকি। তিনমাস পর আমি সুস্থ হবো নাকি এভাবেই একটি শিরা নিয়ে বাঁচতে হবে- আমি জানি না। এ নিয়ে ভাবি না। ব্যক্তিগত এই পোস্টটি দেয়ার একমাত্র কারণÑ যারা চিকিৎসার নামে দিনের পর দিন ডক্টরের দেয়া এন্টিবায়োটিক খাচ্ছেন, সিøপিং পিল খাচ্ছেন, এ্যালার্জির ওষুধ খাচ্ছেন- তাদের সতর্ক করা। তারা সত্যিকার অর্থে রোগমুক্তির জন্য খাচ্ছেন নাকি আমার মতো তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগুচ্ছেন- এ বিষয়ে একটু হলেও ভাবিয়ে তোলা। আমার মতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতা যেন কারো না হয়।

_________________________________

লেখক ঝরনা মনি । সিনিয়র রিপোর্টার। ভোরের কাগজ । একাধিক জাতীয় দৈনিকে চিফ রিপোর্টার হিসেবেও কাজ করেছেন।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।